বিভিন্ন সময়ের তদন্তে দেখা গেছে, ব্যাংক ও এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিয়েই অসাধু ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচার করেছে। এই দুর্নীতি বন্ধে এবার কঠোর আইনি পদক্ষেপে গিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ পাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের জেল-জরিমানা হবে। চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হবে। অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও স্থায়ীভাবে চাকরি যাবে। করদাতাদের হয়রানি করার প্রমাণ পাওয়া গেলে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে।
রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে কঠোর আইনকানুন নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে একগুচ্ছ নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে, যা আজ রবিবার থেকে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত দুই দিনের রাজস্ব সম্মেলনে অংশ নেওয়া শতাধিক এনবিআর কর্মকর্তার কাছে সম্মেলন থেকে ফিরে যাওয়ার পরের দিন পাঠানো হবে। নতুন এসব দিকনির্দেশনা তৈরির পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা নিয়ে তৈরি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, দুর্নীতির কারণে সাময়িকভাবে বরখাস্তদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এতদিন এনবিআরের কাছে থাকলেও এখন থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে।
রাজস্ব প্রদানে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও রাজস্ববান্ধব মানসিকতা বিকাশের উদ্দেশ্যে আজ ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি (রবি ও সোমবার) দুই দিনব্যাপী রাজস্ব সম্মেলন আয়োজন করেছে এনবিআর। একই সঙ্গে আজ রবিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) আগারগাঁওয়ে এনবিআরের নতুন ভবন উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজস্ব সম্মেলন ও নতুন ভবন উদ্বোধন করবেন। এখানে শতাধিক রাজস্ব কর্মকর্তা অংশ নেবেন। রাজস্ব সম্মেলনে রাজস্ব আদায়, ভ্যাটের ও আয়করের ভূমিকা নিয়ে একাধিক সভা-সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনে মতবিনিময় এবং স্টল স্থাপনের মাধ্যমে আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাটবিষয়ক সেবাগুলোর বিষয়ে সাধারণ জনগণকে বাস্তবিক ধারণা দেওয়া হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুমিন বলেন, আগামীতে রাজস্ব আদায় গতিশীল করতে এই সম্মেলনে নেওয়া পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে রাজস্ব আদায় করতে এনবিআর কার্যকৌশল নির্ধারণ করেছে, যা মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজস্ব আদায় বাড়াতে নিজেই নির্দেশনা দেবেন।
রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব দিয়েছেন খোদ সরকারপ্রধানও। আজকের এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সারা দেশ থেকে আসা রাজস্ব কর্মকর্তাদের রাজস্ব আদায়ে দিকনির্দেশনা দেবেন, যা ইতিহাসে প্রথম।
এনবিআরের নির্দেশনাগুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায়, বড় মাপের দাতারা বছরের পর বছর বিভিন্ন কৌশলে সময় বাড়িয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলেছে। এ সুবিধা আদায় করতে অনেক সময় রাজস্ব ফাঁকিবাজরা এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তাদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে। এবারে বড় মাপের করদাতাদের বকেয়া পরিশোধে সর্বোচ্চ চার থেকে পাঁচবার সময় বাড়ানোর সুযোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও আদায় না হলে এনবিআর আদালতে যাবে। আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআরের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী শহরের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়। এক্ষেত্রে এনবিআর সংশ্লিষ্টদের দুই বছর পর অবশ্যই এক বছরের জন্য উপজেলায় রাজস্ব আদায়ে কাজ করতে হবে। কেউ যেতে না চাইলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) থেকে এনবিআর সংশ্লিষ্টদের ওপর নজরদারিতে গুরুত্ব বাড়াতে বলা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে অবশ্যই নজরদারি করতে হবে। রাজস্ব জালের বিস্তারে নতুন করদাতা সংগ্রহে জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর দিতে বলা হয়েছে।
চলতি বছর আরও ২০ লাখ করদাতা সংগ্রহ করতে হবে। ই-পেমেন্ট, ই-ফাইলিং, ই-রিটার্নসহ সকল কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারেও জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে অনলাইনে টিআইএন গ্রহণ, আয়কর রিটার্ন দাখিল, ভ্যাট প্রদান, শুল্কসংক্রান্ত সকল কাজে এসআই কোডা সফটওয়্যার ব্যবহারসহ একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের তথ্য ভান্ডার ব্যবহারের উদ্যোগ সম্পন্ন করার কথা নির্দেশনায় রয়েছে। শুধু এনবিআর কর্মকর্তাদের ওপরই নয়, অসাধু রাজস্ব ফাঁকিবাজদের ওপরও কঠোরতা আনা হয়েছে। ভ্যাট আদায় করেও কোনো ব্যবসায়ী জমা না দিলে তার লাইসেন্স তাৎক্ষণিক বাতিল করতে পারবে এনবিআর কর্মকর্তরা।
আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ। এমন পরিস্থিতিতে নড়েচড়ে বসতে হচ্ছে এনবিআরকে। ঢেলে সাজাতে যাচ্ছে রাজস্ব আদায়ের আইনকানুন। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হবে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা ১৯ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। এতে লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত হবে।
এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রার কথা বললেও তা কীভাবে অর্জিত হবে, সেটি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় কোনোবারই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আদায় হয় না। এবারে এনবিআরকে অবশ্যই নতুনভাবে পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ বা ১,৫৭,৫০০ কোটি টাকা মূল্য সংযোজন কর হিসেবে এবং ৩৪ শতাংশ বা ১,৫৩,০০০ কোটি টাকা আয়কর হিসেবে এবং ৩১ শতাংশ বা বাকি ১,৩৯,৫০০ কোটি টাকা শুল্ক হিসেবে সংগ্রহ করা হবে।
