তার বেড়ে ওঠা নিউজিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ডে। বাবা পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। বেড়ে ওঠার সময় দেখেছেন দারিদ্র্য। তার ভাষ্য, ছোটবেলায় দেখা দারিদ্র্যই ‘বিশ্বাস ও মনন গঠনে’ সহায়তা করেছে।
যোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন জেসিন্ডা। পড়াশোনা শেষে নিউজিল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্কের দপ্তরে কাজ করেন। তখন থেকেই তার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা জন্মায়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সরকারের জ্যেষ্ঠ নীতি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। নিউজিল্যান্ডে ফেরার পর ২০০৮ সালে প্রথম পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। লেবার পার্টির উপনেতা হন ২০১৭ সালে। বছর না ঘুরতেই তিনি লেবার পার্টির প্রধান হন। ২০১৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৭ সপ্তাহ আগে দলের প্রধান হয়েছিলেন। দলীয় প্রধান হয়ে তিনি লেবার পার্টিকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। ২০২০ সালের নির্বাচনে বিপুল জয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হন। যদিও এবার তার জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা দেখা যায়। এর অন্যতম কারণসরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমতে থাকা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ও রক্ষণশীল বিরোধীদের পুনরুত্থান।
এসব বিষয় জেসিন্ডার ওপর চাপ তৈরি করছিল, যার আলামতও প্রকাশ পেয়েছিল। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় ৪২ বছর বয়সী জেসিন্ডা বলেন, তিনি সাড়ে পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা জেসিন্ডার জীবনের সবচেয়ে সার্থক সময়। তবে এ সময় নানা চ্যালেঞ্জও ছিল। জেসিন্ডা বলেন, তিনি একজন মানুষ। রাজনীতিবিদরা মানুষ। তারা যত দিন পারেন, তত দিন সবটুকু দিয়েই কাজ করেন। তারপর সময় হলে সরে দাঁড়ান। এখন সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে।
তবে জেসিন্ডা দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব কঠিন হওয়ার কারণে পদত্যাগ করছেন না। অন্যরা তার চেয়ে আরও ভালো কাজ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করেন। তাই পদত্যাগ করছেন। ২০১৯ সালের মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটি মসজিদে হামলা চালিয়েছিলেন এক উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গ বন্দুকধারী ব্যক্তি। গুলিতে ৫১ জন নিহত হন। আহত হন ৪০ জন। এই হামলার ঘটনা যখন ঘটে, তখন জেসিন্ডার সরকারের বয়স মাত্র ১৮ মাস। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিপ্রিয় একটি দেশে এমন সন্ত্রাসী হামলা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। হতবাক হয়ে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব। হামলার ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হন জেসিন্ডা। হামলার পর তিনি মাথায় স্কার্ফ পরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কথা বলেন ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে। সে সময় তিনি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির যে বার্তা দেন, তা তাকে প্রগতিশীল রাজনীতির বৈশ্বিক আইকনে পরিণত করে। নিউজিল্যান্ডে আগ্নেয়াস্ত্র আইনে সংস্কার ও অনলাইনে ঘৃণা ছড়ানো ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় বড় কোম্পানিকে চাপ প্রয়োগের কারণেও জেসিন্ডা প্রশংসিত হন।
এসব কারণে ২০২০ সালের অক্টোবরে দেশটিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাকে আরও তিন বছরের জন্য ক্ষমতা থাকার রায় দেন দেশের জনগণ। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন জেসিন্ডা। বিশ্বে সবচেয়ে অল্পবয়সী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০১৭ সালে দায়িত্ব নেন। টানা ছয় বছর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অশ্রুসিক্ত হয়ে হঠাৎ দায়িত্ব থেকে তার অব্যাহতির ঘোষণা অবাক করেছে বিশ্বকে। বয়স অল্প হলেও জ্ঞান-গরিমায় অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন জেসিন্ডা। করোনাকালে নিউজিল্যান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল করোনার সময়কাল। করোনাকালে যখন বিশৃঙ্খলায় পূর্ণ গোটা বিশ্ব, তখন ঠাণ্ডা মাথায় দেশকে রক্ষা করেছেন জেসিন্ডা।
জেসিন্ডা আরডার্ন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে গত ২৫ জানুয়ারি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর বিস্ময়কর খবর, বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রধান আলোচিত বিষয়। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর হঠাৎ এই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশকে নতুন করে তার আর দেওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়া। জেসিন্ডা আরডার্ন দ্বিতীয় মেয়াদে গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী বিজয় অর্জন করেছিলেন। নিউজিল্যান্ডে বিরোধী দলসহ কোথাও তার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি।
বর্তমান বিশ্বে এমন একজন সাহসী, দক্ষ ও সৎ মহিলা রাজনীতিবিদ এবং প্রধানমন্ত্রী সত্যিই বিরল। তারপরও ওনার দলের একজনও বলেননি, নিউজিল্যান্ডে জেসিন্ডা আরডার্নের বিকল্প নেই।
সম্ভবত ব্রিটিশ শ্রমমন্ত্রী এস্টেল মরিসের ২০ বছর আগে শিক্ষাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে এ ঘটনার দারুণ মিল আছে। কারণ তিনি সে সময় নিজেকে যথেষ্ট উপযুক্ত বলে মনে করেননি। অনুমান করেন, নিকোলা স্টার্জন-পরবর্তী নির্বাচনে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিকে নেতৃত্ব না-ও দিতে পারেন। যা হোক, সুন্দরভাবে আরডার্নের বিদায় কার্যকর করা যেতে পারে, তবু একজন নারীর প্রস্থান উদযাপনের বিষয়ে কিছুটা অস্বস্তিকর বিষয় রয়েছে বৈকি। কেননা, আরডার্ন এত দিন ধরে যে ধরনের অপমানজনক ব্যবহার ও জীবননাশের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন, তা অনেকের অজানা নয়। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালীন সন্তান জন্মদানকারী দ্বিতীয় নারী নেত্রী তিনি। তিনি কারও কারও কাছে একজন আদর্শ নেত্রী বলে অন্যদের কাছে টার্গেট ছিলেন। তিনি কীভাবে অফিসে মাতৃত্বকালীন ছুটি মোকাবিলা করেন এবং অন্যের আক্রমণে প্রতিরোধ গড়ে তুলে অফিস করেছেন, তা-ও আমাদের অজানা নয়। তিনি তার জীবনসঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি করেছিলেন যে, তিনি প্রাথমিকভাবে তাদের মেয়ের দেখাশোনা করার জন্য বাড়িতেই থাকবেন। এটি এমন একটি কাজ, যা শক্তিশালী পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে অনাদিকাল থেকে শেয়ার করে আসছেন। আবার এটি এমন একটি কাজ, যার জন্য নারীদের আরও সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করা হয়।
জেসিন্ডা মনে করেন, নেতৃত্ব আসলে একটি সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়া; ক্ষমতা হলো অসম্ভব কঠিন বিষয়গুলোর একটি, যার প্রতিটিতে অনিবার্যভাবে রয়েছে কিছু জ্বালাপোড়ার পুঁজি। অথবা অন্যভাবে বলতে গেলে, অধিকাংশ নেতার সব রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় শেষ হয়। আরডার্নের জয় এখানে যে, তিনি সবকিছুকে নিজের হাতে নিয়ে তার প্রস্থানকে শুধু সাফল্যের একটি ভিন্ন প্রতীক ও উপায় হিসেবে পুনর্নির্মাণ করলেন। ২৬ মে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তব্য দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন।
২০১৯ সালের ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসীদের হামলায় ৫১ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। নৃশংস এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি দেখানো হয়েছিল। রয়্যাল কমিশনের তদন্তে জানা গেছে, সন্ত্রাসীরা অনলাইনের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের ঘটনা থেকে আমরা আমাদের দায়িত্ব বোধটা টের পেয়েছি।
আমরা জানতাম, বন্দুকনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দরকার। সেটা আমরা করেছিও। কিন্তু এও জানতাম, যদি সত্যিকার অর্থেই অনলাইনের এই সহিংস মৌলবাদ সমস্যার সমাধান চাই, তাহলে সরকার, সুশীলসমাজ ও টেক কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। মূলধারার গণমাধ্যমের জবাবদিহি থাকে, সাংবাদিকতার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু অন্য অনেকে, যারা আমাদের কাছে তথ্য উপস্থাপন করে, তাদের থাকে না। তোমাদের ক্যাম্পাসেই এমন অনেককে পাবে, যারা বলবে ভুল তথ্য কিংবা গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণ স্রেফ অ্যালগরিদম বা ট্রল নয়; বরং দশক ধরে গড়ে ওঠা অসামঞ্জস্যপূর্ণ গণমাধ্যমের কাঠামো।
ভুল তথ্য ও গুজবের এই যুগে আমাদের তথ্যের বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করা জানতে হবে। এর মানে অবিশ্বাস শেখানো নয়। আমার ইতিহাসের শিক্ষক বুড়ো মিস্টার ফাউন্টেন যেমনটা বলেছিলেন : একটা ছোট্ট তথ্যের সীমাবদ্ধতাগুলোও বুঝতে হবে। প্রতিটি ঘটনা বা সিদ্ধান্তকেই অনেক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যায়। পক্ষপাত তোমাকে সব সময় ঘিরে রাখবে। তুমি আরও বেশি ভুল তথ্যের মুখোমুখি হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমার চারপাশের কোলাহল আরও খারাপের দিকে যাবে। একটা তথ্যকে তুমি কীভাবে কাজে লাগাও, কীভাবে তর্ক-বিবাদের মুখোমুখি হও, খবরের টোপ দিলেই তুমি লুফে নাও কি নাএসবই গুরুত্বপূর্ণ। সামনে শত কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে গিয়ে; সিস্টেম আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পড়ে, ছোট ছোট পদক্ষেপের কার্যকারিতা ভুলে যেয়ো না। নিজের জায়গা থেকে আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রভাব ফেলতে পারি। বৈচিত্র্যকে সমানুভূতি ও উদারতা দিয়ে গ্রহণ করতে পারি। বৈচিত্র্য ও বিভাজনের মাঝখানে কিছু মূল্যবোধ থাকে। যে মূল্যবোধ আমরা আমাদের শিশুদের শেখাই। কারণ আধুনিক বিশ্বের রাজনীতির মাঠে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বড়ই অভাব।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
