মৃত্যুর কোলে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ জেনারেল

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৫:৩৬ এএম

পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ মারা গেছেন। গতকাল রবিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৭৯ বছর বয়সী সাবেক এ সেনাশাসক। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, বিবিসি, জিও নিউজ, ডনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে নির্বাসিত মোশাররফের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, পাকিস্তানের সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠা জেনারেল মোশাররফ ক্ষমতা থাকাকালে ও আগে একাধিকবার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হন। তবে প্রতিবারই মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরেন তিনি। কিন্তু শেষ অবধি নির্বাসিত জীবনে নীরবেই মৃত্যুকে বরণ করতে হলো সাবেক এ জেনারেলকে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পারভেজ মোশাররফ দীর্ঘ রোগভোগের পর রবিবার দুবাইয়ের অ্যামেরিকান ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা গেছেন। তার অসুস্থতার ব্যাপারে গত বছর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অ্যামিলোডয়সিস নামে এক জটিল রোগে ভুগছেন। তার শরীরের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, তার সেরে ওঠার প্রায় কোনো সম্ভাবনাই নেই। ১৯৯৯ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর পশ্চিমের বন্ধুখ্যাত মোশাররফ বারবার বেঁচে গেছেন হত্যাচেষ্টা থেকে। ক্ষমতা ছাড়ার পর ছাড়তে হয়েছে দেশও। তবে দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের ইচ্ছা ছিল তার। গত বছর থেকেই মোশাররফের পরিবার তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু যে নওয়াজ শরিফকে হটিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করেছিলেন তার ভাই শাহবাজ শরিফ সরকার অনুমতি দেয়নি। তাই আলোচিত-সমালোচিত মোশাররফকে পরবাসেই মৃত্যুবরণ করতে হলো। এখন দুবাই থেকে তার মরদেহ পাকিস্তানে আনা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিবিসি বলছে, ১৯৪৩ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের দিল্লিতে জন্ম নেওয়া পারভেজ মোশাররফকে মাত্র চার বছর বয়সেই পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যেতে হয়। তবে কূটনীতিক বাবার সঙ্গে দীর্ঘ সময় থেকেছেন তুরস্কে। ১৯৫৬ সালে ফেরেন পাকিস্তানে। ১৯৬১ সালের পাকিস্তানের কাকুলের সামরিক একাডেমি থেকে কমিশন পান। এরপর তিনি স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপে যোগ দেন। সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি কোয়েটার আর্মি কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ এবং লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব ডিফেন্স স্টাডিজে পড়াশোনা করেছেন।

সাবেক এ সামরিক শাসক ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৯৮ সালে তিনি জেনারেল পদে পদোন্নতি পান, নেন চিফ অব আর্মি স্টাফের দায়িত্ব। তবে এর পরের বছরই কারগিল যুদ্ধে সেনাবাহিনীর জড়িত থাকা নিয়ে তখনকার প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয় তার। সে বছরের অক্টোবরে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নওয়াজ শরিফের সরকারকে উৎখাত করে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন মোশাররফ। তিনি দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেন। সংবিধান স্থগিত করেন। দেশটির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন তিনি। ২০০১ সালের জুনে পাকিস্তানের দশম প্রেসিডেন্ট হন এ সেনাশাসক।

পাকিস্তানের জিও নিউজ বলছে, ক্ষমতায় থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ সমর্থন ও ভূমিকা পালনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত ছিলেন। যদিও এ কারণে স্বদেশে ব্যাপক বিরোধিতার শিকার হতে হয় তাকে। ওই সময়ের মধ্যে বহুবার আততায়ীর হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছেন জেনারেল মোশাররফ। তাকে উৎখাতের বহু প্লটও ব্যর্থ হয়েছে সে সময়।

২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কমপক্ষে চারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন মোশাররফ। প্রথম চেষ্টাটি হয়েছিল ২০০২ সালের এপ্রিলে। সেদিন প্রেসিডেন্ট মোশাররফ যে পথ ব্যবহার করছিলেন, সেই পথে লুকিয়ে রাখা হয় একটি রিমোট-নিয়ন্ত্রিত গাড়িবোমা। কিন্তু চেষ্টাটি ব্যর্থ হয়। যমদূতের হাত থেকে বেঁচে ফেরেন জেনারেল মোশাররফ।

দ্বিতীয় হত্যাচেষ্টাটি হয় ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে। সেদিন ইসলামাবাদে জেনারেল মোশাররফের খামারবাড়ির কাছে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। তবে তার ২০-২৫ মিনিট আগেই ঘটনাস্থল অতিক্রম করে মোশাররফের গাড়ি। বোমাটি রাখা হয়েছিল ফুটপাতের ঠিক পাশে, একটি ড্রেনেজ পাইপে। আবারও বেঁচে যান জেনারেল মোশাররফ।

এ ঘটনার ঠিক ১২ দিন পর দুই ব্যক্তি আত্মঘাতী বোমা নিয়ে জেনারেল মোশাররফকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেন। প্রেসিডেন্টের গাড়িবহরে বোমাবাহী দুটি ট্রাক নিয়ে ঢুকে পড়েন তারা। প্রতিটি গাড়িতে ৪০ কেজির মতো বিস্ফোরক ছিল। এ সময় বিস্ফোরণে ছয় পুলিশ সদস্য ও চার সেনাসদস্যসহ ১৬ জন নিহত হয়। আহত হয় আরও ৪০ জন। তবে হামলার সময় সাঁজোয়া গাড়িতে থাকায় আরেকবার বেঁচে যান জেনারেল মোশাররফ।

পরবর্তী হত্যাচেষ্টাটি হয় এর ঠিক চার বছর পর। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে। সেদিন রাওয়ালপিন্ডির একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে বিমানে উড্ডয়ন করেছিলেন জেনারেল মোশাররফ। আর সেই বিমান লক্ষ্য করেই ছোড়া হয় গুলি। বিমানটি পরে অন্য একটি শহরে অবতরণ করে। সে সময় এ ঘটনার জন্য সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর নিম্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ওপর দোষারোপ করেছিলেন তিনি।

এর মধ্যে ২০০৩ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে হত্যাচেষ্টার দায়ে খালিদ মাহমুদসহ আরও চারজনকে ২০০৫ সালে সামরিক আদালতের রায়ে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে তা কার্যকরও হয়। এ চারটি চেষ্টা ছাড়াও সেনা কর্মকর্তা থাকাকালেও হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সে কথা তার ২০০৬ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘ইন দ্য লাইন অব ফায়ার’ বইতেও বলেছেন।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের ভাষ্য, ক্ষমতায় টিকে থাকতে ২০০৭ সালের ৩ নভেম্বর পারভেজ মোশাররফ ফের জরুরি অবস্থা জারি করেন। সংবিধান স্থগিত করেন। জরুরি অবস্থা জারির ২৫ দিনের মাথায় তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন, তবে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকেন। ২০০৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি জরুরি অবস্থা তুলে নেন। ২০০৮ সালের আগস্টে অভিশংসন এড়াতে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। পরে ছাড়তে হয় দেশও। তবে দেশের বাইরে বসেই ২০১০ সালে পারভেজ মোশাররফ একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তার দলের নাম অল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এপিএমএল)। ওই দলের ব্যানারেই ২০১৩ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য পাকিস্তানে ফেরেন তিনি। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যর্থ হন মোশাররফ। ওই নির্বাচনে জিতে নওয়াজ শরিফ ফের ক্ষমতায় ফিরলে মোশাররফের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় ২০০৭ সালে তার সংবিধান স্থগিত করে জরুরি অবস্থা জারিকে অবৈধ ঘোষণা করায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলার বিচার চলাকালে তার বেশিরভাগ সময় কেটেছে সেনাবাহিনীর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নয়তো ইসলামাবাদের একটি খামারে। পরে ২০১৪ সালের এপ্রিলে তিনি করাচি চলে যান। সেখানে দুই বছর থাকার পর ২০১৬ সালে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। মোশাররফ সংযুক্ত আরব আমিরাত চলে যান। রাষ্ট্রদ্রোহের গুরুতর অপরাধে ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিশেষ আদালতে পারভেজ মোশাররফের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। যদিও ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে লাহোর হাইকোর্ট। এরপর তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করে পরিবার। তবে পাকিস্তান সরকারের সাড়া না মেলায় সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত