দেশকে স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধ করেছিলেন তাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান (মুক্তিযোদ্ধা) হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। স্বাধীনতার ৫১ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও সম্মানী না পাওয়া মুক্তিযোদ্ধার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় প্রায়ই। তেমনই নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের চারজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা কাগজ হাতে নিয়ে বিভিন্ন অফিস-আদালতে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করতে।
তাদের মধ্যে একজন মো. মহুবর রহমান। তিনি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ২ নম্বর বালাপাড়া ইউনিয়নের ভাসানী পাড়া গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিন সরকারের ছেলে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুদ্ধে অংশ নিতে ৬ নম্বর সেক্টর কোম্পানির কমান্ডার আছির উদ্দিনের মাধ্যমে দেওয়ানগঞ্জ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণে যান। পরে আবদুল খালেকের মাধ্যমে ভারত ইয়ুথ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে ফিরে এসে বুড়িমারী হেডকোয়ার্টার ধরলা নদীর বিশাল মাঠে সর্বশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে রাইফেল হাতে দেশকে হানাদারমুক্ত করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বুড়িমারীতে যুদ্ধকালীন মহুবর রহমানের তিনজন সহযোদ্ধা ছিলেন মো. আমিরুল ইসলাম, মো. আশরাফ আলী ও মো. হাফিজুর রহমান। তারা তিনজনেই এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।
তবে সময় কারও অপেক্ষায় থাকে না। প্রতি বছর বাংলাদেশের মানুষ বিজয় দিবস পালন করেন। আর বিজয় মানে উল্লাস, আনন্দের ঘনঘটা। বিজয় দিবসে হাতে ফুল নিয়ে বধ্যভূমির সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে পারছেন স্বীকৃতি না পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মহুবর রহমান। খুব কষ্ট করে কাঁপতে কাঁপতে শহীদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানান। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদু আপনার একটা ছবি তুলতে পারি? তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন না, ছবি তুলতে হবে না। আমি থমকে গিয়ে খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করলাম দাদু ছবি তুলতে নিষেধ করলেন কেন? তিনি বললেন, আজ ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারাই বৈষম্যের শিকার কেন? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি পেতে অফিসে অফিসে ঘুরে বেড়াতে হবে?
স্বাধীনতার ও বিজয় দিবসের ৫১তম বছরে এসেও তিনি আক্ষেপ করে বললেন, এখনো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন না। রাজনীতিটা অপরাজনীতি হয়েছে। সবকিছুই যেন আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীতেও তার কোনো সুরাহা হলো না। কেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ দিতে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াতে হবে? তার যে প্রমাণ রয়েছে, এতে তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এর কোনো সন্দেহ নেই।
বড় উদ্বিগ্নতার বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে অনেক চেষ্টা-তদবির করেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ হয়নি। তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তিনি বঞ্চিত রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে পারছেন না তিনি। নিজ গ্রামের মানুষসহ উপজেলার অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা মহুবর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা বলে ডাকলেও কাগজে-কলমে তার স্বীকৃতি মেলেনি স্বাধীনতার ৫১ বছরেও। ৬৫ বছর বয়সী মহুবর রহমান অলস সময়ে ঝাপসা চোখে এখন শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থন করেন।
চারদিকে গোলাগুলি, মানুষ প্রাণে বাঁচার জন্য ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন ভারতে। কিন্তু দেশ থেকে পালিয়ে না গিয়ে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তিনি হলেন মো. মজিবর রহমান। তিনি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বাঘডোগাড়া ইউনিয়নের মৃত সহিমুদ্দিনের ছেলে। বর্তমানে ডিমলা উপজেলার ২ নম্বর বালাপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাতনাই বালাপড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। পরিবারের সাত সন্তানসন্ততি নিয়ে অভাবে জীবনযাপন করছেন। তার সবুজ মুক্তিবার্তা নম্বর : ০৩১৫০২০১৬৬। তিনি ১৯৭১ সালে ৬ নভেম্বর ভারতের কুচবিহার জেলার হলদিবাড়ী থানার দেওয়ানগঞ্জের ইয়ুথ ক্যাম্প নামক জায়গায় প্রথম যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
সেখান থেকে ফিরে এসে বুড়িমারী হেডকোয়ার্টার ধরলা নদীর বিশাল মাঠে সর্বশেষ প্রশিক্ষণ ৬ নম্বর সেক্টর কোম্পানির কমান্ডার আছির উদ্দিনের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনিও বয়সের ভারে চোখে তেমন দেখতে পারেন না। এ বৃদ্ধ বয়সে এসেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। এখন সব যেন নিয়তির খেলা বলে হতাশ হয়ে সব আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
৬ নম্বর সেক্টর কোম্পানির কমান্ডার আছির উদ্দিনের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেন। তার সবুজ মুক্তিবার্তা নম্বর : ০৩১৫০২০১০৯। তিনি গুলিবিদ্ধ পায়ের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে প্রতি বছর শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসে শুধু চোখের জল ফেলে যান। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সমাজে কি আমার কোনো মূল্য নেই! তার এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র তখনই দিতে পারবে যখন রাষ্ট্র তাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেবে। দেশের স্বাধীনতার ৫১ বছরে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও এখনো মুক্তি ভাটিয়ার দেহে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে।
সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার সহযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তিনি সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো স্বীকৃতি পাননি। তার সংসার জীবনের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে করে, গ্রামে পাড়া-প্রতিবেশীর কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে তার পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন অন্যের জমিতে দুটি কুঁড়েঘর তৈরি করে জীবনযাপন করছেন। বৃদ্ধ বয়সেও পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে মানুষের চুল কেটে যে টাকা পান তা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাতে হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন রাষ্ট্রের বৃদ্ধভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তখন রাষ্ট্রের উচিত বিষয়গুলো গুরুত্বসহ আমলে নিয়ে এর সমাধানের প্রকৃত পথ খুঁজে বের করা। বালাপাড়ার প্রকৃত চার মুক্তিযোদ্ধার করুণ দুর্দশা কবে দূর হবে? এর জবাব কে দেবে?
স্বাধীনতার ৫১ বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি পাওয়া তাদের অধিকার। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে মহুবর রহমান, মজিবর রহমান, সুরুজামাল এবং মজিবর রহমানের (নাউয়া) মতো শত শত মুক্তিযোদ্ধা। তারা আজ টাকার অভাবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারছেন না তারা মুক্তিযোদ্ধা। রাজাকারদের পেশিশক্তি ও অর্থের দাপটের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারের নাম উচ্চারণ করতেও যেন তারা ভয় পান। বিভিন্ন সময় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা নানা কৌশলে, রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হননি। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে না পারা জাতির জন্য লজ্জাজনক বিষয়।
মৃত্যুর আগে পর্যন্ত হলেও তারা যেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান। তাদের কান্না বাংলার মানুষ দেখতে চান না। বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তারা স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিনিয়ে এনেছেন। ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা কখনো তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেননি। মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে এ দেশের স্বাধীনতা এনেছেন, পরবর্তী প্রজন্মকে স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছেন। সেই বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানরা আজকে অবহেলিত হবেন কেন? তাদের অনেক বয়স হয়েছে, যেকোনো দিন মারা যেতে পারেন। কিন্তু মরার আগেই অন্তত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তারা যেন নিজের নামটি দেখে যেতে পারেন। তাই নতুন বছরের প্রত্যাশা, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক
