তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে পশ্চিমের পুরনো শহর গাজিয়ানতেপ, সেখান থেকে ১৩০ মাইলেরও বেশি পশ্চিমের শহর আদানায় বসবাস করেন নিলুফার আসলান। গতকাল সোমবারের ভোর তার কাছে স্মরণীয় হয়ে গেল। সবার অজান্তে যখন নড়ে উঠল অভিশপ্ত আনাতোলিয়া ফল্ট লাইন, ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে তখন কেঁপে উঠল গোটা গাজিয়ানতেপ। এ ভূমিকম্পে যখন নিলুফারদের পঞ্চমতলার অ্যাপার্টমেন্ট কেঁপে উঠে তখন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা সবাই মারা যাবেন, এমনটা ধরেই নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এমন ভূমিকম্প কখনো দেখিনি। আমরা প্রায় এক মিনিটের জন্য দুলছিলাম। তখন আমি পরিবারের সদস্যদের বললাম, ভূমিকম্প হচ্ছে, চলো সবাই একসঙ্গে এক জায়গায় মরি। এ বিষয়টিই তখন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।’
ভূমিকম্প থেমে যাওয়ায় বাসা থেকে বেরিয়ে আসা আসলান বলেন, ‘আমি কোনো কিছু সঙ্গে নিতে পারিনি। শুধু জুতো পরেই বাইরে চলে এসেছি। আমাদের ভবনের আশপাশের অন্তত চারটি ভবন একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে।’
ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে যখন ভয়াবহ ঝাঁকুনিতে ভবনগুলো দুলছে তখন গাজিয়ানতেপের বাড়িতে ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে ওঠেন এরদেম। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমার ৪০ বছরের জীবনে এমন ভূমিকম্প কখনোই দেখিনি। আমরা অন্তত তিনবার অত্যন্ত জোরালভাবে কেঁপে উঠলাম। ঠিক যেভাবে দোলনায় শিশুরা দোল খায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে বাঁচার জন্য লোকজন তাদের গাড়িতে করে পালাতে থাকে। আমার ধারণা গাজিয়ানতেপের কোনো বাড়িতে একজন মানুষও আর নেই।’
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল গাজিয়ানতেপ থেকে ৩০০ মাইল পূর্বের দিয়ারবাকির এলাকায় উদ্ধারকারীদের সাহায্য করার জন্য রাস্তায় ছুটে আসেন লোকজন। ৩০ বছর বয়সী এক যুবক বিবিসিকে বলেন, সর্বত্রই চিৎকার। আমি হাত দিয়ে পাথর সরাতে শুরু করলাম। আমরা বন্ধুদের সহায়তায় আহতদের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করেছি। কিন্তু আর্তনাদ থামছে না। এরপর উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা আসেন। শহরের অন্য একটি এলাকায় মুহিত্তিন ওরাকসি নামে এক ব্যক্তির পরিবারের সাত সদস্য চাপা পড়েছেন বলে জানান তিনি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে মুহিত্তিন বলেন, ‘আমার বোন এবং তার তিন সন্তানও চাপা পড়েছে এবং তার স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িও চাপা পড়েছে।’
ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে। সেখানকার স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক জিয়াদ হাজে তাহা বলেন, ‘বিপর্যয়ের পর আহত ব্যক্তিরা ঢেউয়ের মতো ছুটে আসছে।’
ভোরের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ইতিমধ্যে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তুরস্ক-সিরিয়া। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য মানুষ, প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিবেশে চলছে উদ্ধারকাজ। নিহতের সংখ্যা বাড়ছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়।
