রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গবেষণা বরাদ্দ বাড়লেও কমেছে গবেষেণা-প্রকাশনার সংখ্যা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালে মাত্র ১৭টি গবেষণা প্রকাশ হয়েছে; যেখানে ২০২০ সালে ছিল ১৮৩টি। তবে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও গবেষকরা বলছেন, ইউজিসির প্রকাশনায় রাবির যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অসংগতি রয়েছে। প্রতিবেদনে মূল তথ্যটি আসেনি।
গত ৩০ জানুয়ারি ইউজিসি তাদের ৪৮তম বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ছিল ৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ২ হাজার ৫১৭টি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে গবেষণা ব্যয় ৩ কোটি টাকা। যার বিপরীতে প্রকাশনা ৭৬৬টি। চট্টগ্রাম
বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা হলেও প্রকাশনা সংখ্যা নেই। রাজশাহী বিশ^বিদ্যলয়ে গবেষণা ব্যয় ৫ কোটি টাকা। অথচ তার বিপরীতে গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা মাত্র ১৭টি।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা বলছেন, শিক্ষকরা শুধু পদোন্নতির আশায় গবেষণা করছে। ফলে অনেক শিক্ষক অধ্যাপক পদে পদোন্নতির পরে গবেষণা বাদ দিচ্ছেন। আর বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন গবেষকদের দেখভাল করার অভাবে আশানুরূপ প্রকাশনা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মনজুর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রকাশনা সংখ্যা কম হওয়ার তিনটি কারণ আছে বলে আমার মনে হয়। একটি হলো শিক্ষকরা গবেষণা করছে, কিন্তু তাদের প্রকাশনাগুলো ঠিকমতো জমা দিচ্ছে না। দ্বিতীয়টি, যারা গবেষণা করছেন তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্পর্ক কম। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গবেষকদের সঠিকভাবে দেখাশোনা করে না। তৃতীয়ত, যে শিক্ষকরা গবেষণা করছে তার অধিকাংশই পদোন্নতির জন্য গবেষণা করে। পদোন্নতি হয়ে গেলে সে গবেষণা করা বাদ দেয়। ফলে প্রকাশনার সংখ্যা কমে যাচ্ছে।’
বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ও প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, এ তথ্যটি সঠিক নয়। কারণ আমার জানা মতে, এবার এক শিক্ষক একাই ১৪টি গবেষণা করেছে এবং সেগুলো সব ভালো মানের। সুতরাং খোঁজ নিলে দেখা যাবে এক বিভাগ থেকেই ৫০-এর অধিক প্রকাশনা হয়েছে; অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে অনেক গবেষণা হয়েছে। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের গবেষণাগুলো ওয়েবসাইটে আপলোড করছে না, এটা সঠিক। তবে গবেষণা করছে না, এটা সঠিক নয়।
বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকাশনা আমাদের ১৭টি নয়, ১৭শ হয়েছে। শিক্ষকরা প্রকাশনা করে পত্রিকাগুলোতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাদের সেগুলো ওয়েবসাইটে দিতে বলা থাকে কিন্তু তারা দিচ্ছে না। আমাদের প্রকাশনার ঘাটতি নেই। ঘাটতি আছে তথ্যের। যেটা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে হচ্ছে। আবার শিক্ষকদের বলা হলেও তারা সঠিক তথ্য দিতে চায় না। শিক্ষকরা প্রকাশনাগুলো তখনই দিচ্ছে, যখন সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক কিংবা সহযোগী থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য যে কয়টি প্রকাশনা প্রয়োজন, ঠিক সেগুলোই দিচ্ছে। এক কথায় বলা যায়, আমাদের প্রকাশনা সংখ্যা জানার প্রক্রিয়াগত বিষয়টি এখনো গড়ে ওঠেনি।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউজিসির দেওয়া প্রতিবেদনে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, এতে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অসংগতি রয়েছে। যে কারণে মূল তথ্যটি আসেনি। তবে আমাদের শিক্ষকদের কিছু গাফিলতি আছে। তারা সময়মতো তাদের প্রকাশনার তথ্যগুলো ওয়েবসাইটে আপলোড করে না। বার্ষিক প্রতিবেদনের জন্য বারবার চাওয়ার পরও তারা দেয়নি। প্রকাশনাগুলো চাইতে চাইতে আমরা রীতিমতো হয়রান।’
এক বছরে কমেছে ১২ হাজার শিক্ষার্থী : এক বছরের ব্যবধানে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে (রাবি) প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর কমে গেছে। বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে এ তথ্যও উঠে এসেছে। যেখানে ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী থেকে কমে ২৬ হাজার শিক্ষার্থীর হিসাব দেখানো হয়েছে।
বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৮তম ওই বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৩৮ হাজার ২৯১ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ১ হাজর ১৫০ জন; অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ঃ৩৩। ২০২০ সালে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা একই ছিল কিন্তু শিক্ষক ছিলেন ১ হাজার ৯৭ জন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ঃ৩৫। সর্বশেষ ২০২১ সালের বিশ^বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ২৬ হাজার ৩৭০ জন। যার বিপরীতে শিক্ষক ১ হাজার ১০৮ জন; অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ঃ২৪।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখার এক উপরেজিস্ট্রার বলেন, করোনাকালীন বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে ২০১৯ সালের তথ্যই ২০২০ সালে দেওয়া হয়েছিল। যে কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একই ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে সঠিক তথ্যটি পাঠানো হয়েছে। যেখানে ২৬ হাজার শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে। করোনায় একই ইয়ারে একাধিক ব্যাচ ছিল। করোনার পরে সেই ব্যাচগুলো বের করে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।
এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর ৪ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করি। সেই হিসাবে ৫ ইয়ারে ২০ হাজার শিক্ষার্থী হওয়ার কথা, কিন্তু ছিল ৩৮ হাজার। বিষয়টা কেমন না? এটা হয় সাধারণত সেশনজটের কারণে। সেশনজট না থাকলে সংখ্যাটা ২০ হাজারেরও কম হবে। আবার একাধিক ইয়েরে জট থাকলে সংখ্যাটা আবার বেশি হবে। মহামারীর পরে অনেক ব্যাচ বের হয়ে গেছে, যে কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে ২৬ হাজার হয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘যখন সেশনজট থাকে সাধারণত বেশি শিক্ষার্থী থাকে। কারণ অনেক বিভাগের আগের বছর পরীক্ষা হয় না। আবার নতুন একটা ব্যাচ চলে আসে। তখন দুটোকেই হিসাব করতে হয়। তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখায়। এখন আগের মতো সেশনজট নেই বলেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি বাতিল করে চলে গেছে। তাই শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।’
