এর আগে দুবার বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিরোপা খুব কাছে গিয়েও তা ছোঁয়া হয়নি। সেই আক্ষেপ ভুলতেই অনন্য রূপে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন শামসুন্নাহার। কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন আদর করে ডাকেন চাম্পু বলে। সেই চাম্পুই দেশকে আরেকবার শিরোপা জয়ের উপলক্ষ এনে দিয়েছেন সামনে থেকে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচ গোল করে সবাইকে ছাড়িয়ে জিতেছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব। সেই স্বীকৃতি নিয়ে মঞ্চ ছাড়তে না ছাড়তেই উচ্চারিত হয় বাংলাদেশ অধিনায়কের নাম। টুর্নামেন্ট সেরা স্বীকৃতিটাও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। অথচ প্রথম ম্যাচে পাওয়া মাথায় আঘাত পুরোটা আসরেই ভুগিয়েছে তাকে। তবে সেই চোটকে পাত্তা দেননি। দেশের স্বার্থে ফাইনাল দিয়েছেন সামর্থ্যরে পুরোটুকু। তাতেই মাথা উঁচু করে বলতে পারছেন, ‘আমিও শিরোপা এনে দিতে পারি।’
ফাইনালে দলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি ছিল শামসুন্নাহারের। গড়নে ছোটখাটো। তবে মাথায় বাঁধা গোলাপি রঙা ব্যান্ড আর বল পায়ে গতির ঝড় তুলে নিজেকে আলাদা করেই চিনিয়েছেন সিনিয়র জাতীয় দলকে গত সেপ্টেম্বরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখা ফরোয়ার্ড। ক্যারিয়ারে অনেকবার শিরোপা উৎসব করেছেন। তবে আগের দুবার হয়নি বলেই এই আসরের শিরোপার মুখিয়ে থাকাটা অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি, ‘অনেক শিহরণ অনুভব করছি। এর আগে দুই আসরে অধিনায়কত্ব করে ফাইনাল খেলেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। এই প্রথম শিরোপা জিতলাম। আমাকে নিয়ে সবার একটা আক্ষেপ ছিল। সবাই বলত, তুমি কেন শিরোপা আনতে পার না? তোমার হাতে ট্রফি নেই।’ একটু থেমে বলতে শুরু করলেন, ‘এবার আমি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছি, আশা করেছি, এবার ঘরের মাঠে খেলা, ট্রফিটা যেন ঘরেই থাকে। সবচেয়ে বড় পাওয়া অধিনায়ক হিসেবে আমি চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, আমার দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটা ভাগ্যের ব্যাপার। দলের সবার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা।’ প্রথম ম্যাচে মাথায় চোট পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন শামসুন্নাহার। সেই কনকাশনের প্রভাব ছিল পুরো আসরেই। তবে একটা বারের জন্যও ভাবেননি মাঠের বাইরে থাকার, ‘আমি চোট পেয়েছিলাম, কিন্তু আমি যদি না থাকি তাহলে আমার দলের ইয়ে হয়ে যাবে (মনোবল ভেঙে যাবে)। তাই খেলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং আমি পেরেছি।’
কমলাপুরের কাল রাতে উৎসবের কেন্দ্রে ছিলেন শামসুন্নাহার। তবে পুরো আসরে শাহেদা আক্তার রিপা যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, তাতে তাকে এই সাফল্যের পার্শ্বনায়ক বলাই যায়। বিশেষ করে ফাইনালে আরেকবার রিপা নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন নজরকাড়া ফুটবলে। প্রথম গোল করিয়েছেন। এরপর বদলি উন্নতি খাতুনকে দিয়ে করিয়েছেন দলের শেষ গোলটি। দুবছর আগে এই মাঠেই সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিততে বড় ভূমিকা ছিল রিপার। করেছিলেন আসর সেরা ৫ গোল। এই আসরেও করেছেন তিন গোল। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এমন পারফরম্যান্সের পর রিপার স্বপ্ন এখন সিনিয়র জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া, ‘এর আগে এই মাঠে অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম, এবার অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়ন হলাম। অবশ্যই ভালো লাগছে। গোলটা করার পর মনে হচ্ছিল কাপটা এবার আমরাই নেব। ভুটান ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেছিলাম বলে আক্ষেপ ছিল। সেটা এখন দূর হয়ে গেছে। এখন লক্ষ্য সিনিয়র দলে জায়গা পাওয়া।’
উৎসবের ভিড়ে দলের সাফল্যের নেপথ্যের নায়ক গোলাম রব্বানী ছোটনকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে সংবাদকর্মীদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখা এই কোচ এবারের সাফল্যের কৃতিত্ব দেন অনেকটাই স্নেহের ‘চাম্পুকে’। আসরসেরা গোলকিপার রুপনা চাকমার প্রশংসাও ঝরেছে তার কণ্ঠে, ‘শামসুন্নাহার আমাদের কী প্লেয়ার। আমার দৃষ্টিতে দলের জন্য সে আলাদা অনুপ্রেরণা। আর আমি সবসময় বলেছি রুপনা দক্ষিণ এশিয়ার সেরা। গত রাতে ওকে বলেছিলাম আবারও তোমার সামনে সেরা প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ। সেটা সে দেখিয়েছে।’ ছোটন তার শিষ্যদের মধ্যে অমিয় সম্ভাবনা দেখছেন, ‘মারিয়া মান্ডারা ২০১৪ সাল থেকে খেলে একটা পর্যায়ে এসেছে। তবে আমি মনে করি এই দলের মেয়েরা যদি পর্যাপ্ত সুযোগ পায়, তবে মারিয়াদেরও একটা সময় ছাড়িয়ে যেতে পারবে।’
