বাতাসে লাশের গন্ধ মাটিতে বাঁচার লড়াই

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:১২ এএম

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্প-কবলিত এলাকায় মৃত্যু এখন পরিবর্তনশীল সংখ্যা মাত্র। সময় যত গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে লাশের সারি। একদিকে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনছেন, অন্যদিকে চলছে সেগুলোর শনাক্তকরণ ও সৎকারের চেষ্টা। তবে এত বেশি মরদেহ আলাদা আলাদা কবর দেওয়ার সময়সাধ্য নেই ওইসব এলাকার কর্র্তৃপক্ষের। ফলে বাধ্য হয়েই গণকবরে শুয়ে দেওয়া হচ্ছে মরদেহগুলো। কবরস্থান, হাসপাতাল আর ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে লাশের গন্ধ। এ অবস্থার মধ্যেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একের পর এক মরদেহ বের করে আনার ফাঁকে হঠাৎ জীবিতও পাওয়া যাচ্ছে দু-একজনকে। তবে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া আর দফায় দফায় আফটার শকে বিলম্বিত হচ্ছে উদ্ধারকাজ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো যারা জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন ক্ষুধা আর শীতে তাদের জীবিত উদ্ধারের আশা ম্লান হচ্ছে ক্রমেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্য, আশ্রয়, পানি, খাদ্য, জ¦ালানি ও বিদ্যুৎবিহীন থাকায় উদ্ধারকর্মী এবং বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকেও বেঁচে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, এসবের অভাবে আরেকটি বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে যা ভূমিকম্পের চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেছে ২০১১ সালের ফুকোশিমা ট্র্যাজেডিকেও। দুই দেশের সরকারি তথ্যের বরাতে আলজাজিরা বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ২টা অবধি নিহত হয়েছে ২০ হাজার ৭২৩ জন। এর মধ্যে তুরস্কে নিহত হয়েছে ১৭ হাজার ৪০৬ আর সিরিয়ায় ৩ হাজার ৩১৭ জন। নিহতদের মধ্যে আছে কয়েক হাজার শিশু।

আলজাজিরা বলছে, তুরস্কের প্রায় দেড় কোটি মানুষ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির কর্র্তৃপক্ষ ধ্বংসস্তূপ থেকে আট হাজার জনকে জীবিত উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় চার লাখ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে সরিয়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র, হোটেলসহ পরিচিতজনদের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তুর্কি সরকারের। তবে রয়টার্স ও বিবিসিসহ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, দুর্গত এলাকার মানুষ চার দিন পরেও উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ সহায়তা না পৌঁছানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয়রা।

রয়টার্স বলছে, ভূমিকম্পের পর জরুরি পরিষেবাগুলো সাড়া দিতে অনেক দেরি করেছে, এমন অভিযোগকে ঘিরে তুরস্কে অসন্তোষ বাড়ছে। কিছু এলাকায় লোকজন দুদিন অপেক্ষা করার পরও জরুরি পরিষেবার দেখা পায়নি। তবে ভূমিকম্পের পর বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনে এসে উদ্ধারকাজ জোরদার হলেও ইতিমধ্যে পরিস্থিতি অনেক নাজুক হয়ে পড়েছে। তুরস্কের ভূমিকম্প বিধ্বস্ত গাজিয়ানতেপ শহরে ত্রাণ কাজে নিয়োজিত ইসলামিক রিলিফ দলের কর্মী সালাহ আবৌগ্লাসেম বলেছেন, সময়ের সঙ্গে পাল্লায় আমরা সত্যিই হেরে যাচ্ছি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও উদ্ধাকাজে কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ আছে বলেও দাবি করেছেন। কিন্তু বিরোধী দল তার এ দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে।

আর তুরস্কের প্রতিবেশী সিরিয়ায় বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছিল। এর মধ্যে ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশ সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আর অন্য অংশ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধারকাজে সমন্বয়েও সমস্যা হচ্ছে। তবে চতুর্থ দিন ত্রাণের প্রথম বহর সিরিয়ায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। তারা জানান, তুরস্ক থেকে ত্রাণ নিয়ে ছয়টি লরি ইদলিবের বাব আল-হওয়া সীমান্ত অতিক্রম করেছে।

সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই অন্তত ১ হাজার ৯০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা দাতব্য সংস্থার কর্মীরা। হোয়াইট হেলমেটের কর্মীরা বলেন, এখনো শত শত পরিবার ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। যতই সময় গড়াচ্ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া পরিবারগুলোকে উদ্ধার করার আশা ততই স্তিমিত হয়ে আসছে। এমনকি যারা নিজের চেষ্টায় বের হয়ে আসতে পেরেছে, তাদেরও বেঁচে থাকতে লড়াই করতে হচ্ছে।

হোয়াইট হেলমেটের কর্মী আসিম আল জাওয়াহিয়া বলেন, আমাদের উদ্ধারের সরঞ্জামাদির ভীষণ অভাব। এখনো হাজার হাজার মানুষ আটকে আছে ধ্বংসস্তূপে। এখনো হাজারো মরদেহ আছে ধসে পড়া ইট-বালি আর কংক্রিটের দঙ্গলে। ইদলিবের বাতাসে এখন শুধু মৃত্যুর গন্ধ। জীবনের আশা এখানে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ত্রাণের অভাবে বেঁচে যাওয়ারাও নতুন করে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছে।

১১ বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার অবস্থা একেবারেই নাজুক হয়ে আছে। ভূমিকম্পের আগে থেকেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের মানবিক সহায়তার দরকার ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত