গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ফসলি জমি দখল কিংবা ভাড়ায় নিয়ে লোকালয়ে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত ইটভাটা। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর নেই কোনো অনুমোদন বা পরিবেশ ছাড়পত্র। ফলে এসব ইটভাটায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ, ঝুঁকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। এগুলোর মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশে মাত্র ৭টি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন। গুঁড়িয়ে দেওয়া এসব ইটভাটায় এখন সবুজ ফসলের সমারোহ। ধানসহ বিভিন্ন রবিশস্যে ভরে উঠেছে ইটভাটা প্রাঙ্গণ। এ যেন মৃত্যুপুরীতে প্রাণের সঞ্চার। ইটভাটাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় উপজেলায় প্রায় ৫০০ বিঘা জমি আবাদের আওতায় এসেছে, যা কৃষি খাতে আশার আলো দেখাচ্ছে। পরিবেশ বিধ্বংসী বাকি সব অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল হওয়া ফসলি জমি আবাদের আওতায় আনার দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈরে তিন ফসলি কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে গড়ে ওঠা প্রায় অর্ধশত ইটভাটার অধিকাংশই অবৈধ। বিভিন্ন সময় এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনের পরও বন্ধ হয়নি অবৈধ ইটভাটাগুলো। একদিকে ইটের পরিবর্তে ব্লক প্রস্তুতের পরিকল্পনায় ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। অপরদিকে দেশের সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এসব নির্দেশ উপেক্ষা করে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কৃষিজমির টপ সয়েল কেটে দেদার চলছে ইটভাটাগুলো। জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। এতে হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি খাত ও জীববৈচিত্র্য। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে হাইকোর্ট এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন। ওই অভিযানে সাহবাজপুর এলাকার এনবিসি; ডুবাইল এলাকার একতা, আরএসএম ও জেআরএস; সোনাখালী এলাকার কেবিসি ও দরবাড়িয়া এলাকার এসএনবি ব্রিকসসহ মাত্র ৭টি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। যার ধ্বংসস্তূপের সর্বশেষ ইটগুলো সংগ্রহ করছেন ইটভাটার মালিকরা। গুঁড়িয়ে দেওয়া এসব ইটভাটার প্রায় ৫০০ বিঘা তিন ফসলি জমি এ বছর আবাদের আওতায় এসেছে। আবাদ করা হয়েছে সরিষা, ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন সবজি। সব ঠিকঠাক থাকলে এ মৌসুমে উপজেলায় ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ রোধে কমবে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। এভাবে উপজেলার অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ হলে আরও হাজার হাজার বিঘা জমি ফসলে ভরে উঠবে বলে মনে করছে সচেতন মহল। তবে প্রশাসনের সদিচ্ছা হলেই কেবল এটা সম্ভব।
গুঁড়িয়ে দেওয়া ইটভাটার একাধিক মালিক ও ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করে অভিযোগ করেন, ‘জমি ভাড়া নিয়ে ইটভাটা করেছিলাম। পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিবছর কাগজপত্র নবায়ন করত। এখন অনেক বেশি টাকা চাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। যারা চাহিদা মতো টাকা দিতে পারছে, তাদের ইটভাটাগুলো চলছে। আর আমরা টাকা দিতে পারিনি বলেই শুধু আমাদেরটা বন্ধ করে দিয়েছে।’
অল্পসংখ্যক ইটভাটার কাগজপত্র আছে স্বীকার করে উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরজু মিয়া বলেন, ‘৪৪টি ইটভাটা ছিল। এর মধ্যে ৭টি ইটভাটা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। ২৬টি চলমান রয়েছে। বাকিগুলো চালানোর জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ আছে একটু জায়গাও খালি থাকবে না। সে অনুযায়ী গুঁড়িয়ে দেওয়ায় এসব ইটভাটায় ব্যবহৃত জমিগুলোতে ফের আবাদ হচ্ছে। তবে সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ হলে কালিয়াকৈরে কৃষি অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে।’
ইটভাটার জমিতে আবাদের জন্য সাধুবাদ জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, ‘কৃষকরা আবেদন করলে কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রণোদনা, বিনামূল্যে সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া আরও যে অবৈধ ইটভাটা আছে, সেগুলোও অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা হবে।’
