আইনি ইতিহাসে দাগ সৃষ্টি করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৩:০৬ এএম

আদালত অবমাননার রুল দেওয়ার পরও এফিডেভিট (হলফনামা) করে এর জবাব না দেওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার) সভাপতিসহ তিন আইনজীবীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে সেখানে আইনজীবীদের আদালত বর্জন কর্মসূচি এবং আইনজীবীরা বিচারপ্রার্থীদের হুমকি দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীরা শক্তি প্রয়োগ করে দেশের লিগ্যাল ইতিহাসে কালো দাগ সৃষ্টি করেছেন। রুলের জবাব না দিলে আদালত অবমাননার এ মামলা আনকন্টেস্টে (একতরফা) আদেশ হবে বলে মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট।

বিচারক ও আইনজীবীদের টানাপড়েনের জের ধরে এক মাসের বেশি সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে অস্থিরতা চলছে। এর মধ্যে কয়েক ধাপে আদালত বর্জন কর্মসূচি পালন করেছেন আইনজীবীরা। সম্প্রতি আইনজীবীদের আদালত বর্জনের কারণে সেখানকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ আসামিরা নিজেরাই মামলার শুনানি করেন। গতকাল মঙ্গলবার থেকে জেলা ও দায়রা আদালতে বিচারকাজ চললেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ বর্জন কর্মসূচি অ্যব্যাহত রেখেছেন আইনজীবীরা।

গত ২ জানুয়ারি জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ ফারুক ও আদালতের কর্মচারীদের সঙ্গে আইনজীবীদের অশালীন আচরণ, গালাগাল, হুমকি ও এজলাসে হট্টগোলের অভিযোগ আসে সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টকে বলেন। এরপর ৫ জানুয়ারি এক আদেশে জেলা বারের সভাপতি মো. তানভীর ভূঞাসহ তিন আইনজীবীকে তলব করে কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে রুল দেয় হাইকোর্ট। ১৭ জানুয়ারি শুনানি নিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি (গতকাল) আবারও তিন আইনজীবীকে হাজির হতে নির্দেশ দেয় আদালত। এর ধারাবাহিকতায় বিষয়টি শুনানিতে আসে।

গতকাল তাদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।

শুনানিকালে অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন ফকির হাইকোর্টকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার ও আদালতের বিষয়টি শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে এগোচ্ছে। আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আদালত তখন উষ্মা প্রকাশ করে বলে, ‘সমাধান কিছুই হয়নি। আমরা সবই দেখছি। এটার কনসিকোয়েন্স (পরিণতি) কিন্তু সবাইকে ভোগ করতে হবে।’

আদালত আরও বলে, ‘এক মাস হয়ে গেছে। রুলের জবাবে এফিডেভিট দেননি। দিলে দেন, না দিলে না দেন। তবে যদি জবাব না দেন তাহলে এ মামলা একতরফা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। আমরা আমাদের মতো এগোব।’

হাইকোর্ট বলে, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার (আইনজীবী সমিতি) দেশের আইনজীবী সমাজে কলঙ্কের সৃষ্টি করেছে। আদালতের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অচল করে রেখেছে। কোর্ট বর্জন করেছে, বিচারপ্রার্থীরা গেলে তাদের হুমকি দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। বারের প্রেসিডেন্ট হোন আর যেই হোন, কেউই কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বার কাউন্সিল কিছু না করলে আমরা এখান থেকেই সিদ্ধান্ত নেব। এ আইনজীবীরা কোর্টে প্র্যাকটিস করার যোগ্য কি না সেটাও আমরা দেখব।’

শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি পরিস্থিতির উন্নতিতে এক মাস সময়ের আরজি জানালে হাইকোর্ট আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তুষার কান্তি রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে আইনজীবীদের ভূমিকা এবং এক মাসের বেশি সময় পার হলেও আদালত অবমাননার রুলের জবাব না দেওয়ার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। ২৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির তারিখ রেখে তাদের ওইদিন আবারও আদালতে হাজির থাকতে বলেছেন হাইকোর্ট।’

অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আগামী ধার্য তারিখের আগেই রুলের জবাব দেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত