গোপনে ফিফা সদর দপ্তরে সোহাগ

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:০৫ এএম

১৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনে স্বাভাবিক ব্যস্ততা চোখে পড়ল না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে একটা আয়েশি ভাব। তাতেই সন্দেহ জাগল। এমন তো হওয়ার কথা নয়। ফুটবল রসাতলে যাক, ফুটবলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেখলে মনে হবে, তারা অনেক সিরিয়াস। তো হঠাৎ করে কী এমন হয়ে গেল সবার মধ্যেই একটা গা-ছাড়া ভাব! অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল অফিসে নেই প্রশাসনিক প্রধান, সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ। এ ছাড়া কম্পিটিশনস ম্যানেজার জাবের বিন তাহের আনসারি, মিডিয়া বিভাগের লোক না হয়েও রহস্যময় কারণেই জাতীয় দলের মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে আসা হাসান মাহমুদ ও অর্থ বিভাগের সহকারী কর্মকর্তা অনুপম সরকারও উপস্থিত নেই বাফুফে ভবনে। উপস্থিত যারা আছেন, তারা কেউই বলতে পারলেন না একসঙ্গে চার কর্মকর্তা অফিসে নেই কেন? তাদের মুঠোফোনে কল করেও বন্ধ পাওয়ায় সন্দেহটা বাড়ল। আরও একটু খোঁজ করতেই জানা গেল সোহাগ বাকি তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে রয়েছেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখের পথে। বুঝতে বাকি রইল না তাদের গন্তব্য ফিফা সদর দপ্তর। এই কর্মকর্তার সঙ্গে একজন আইনজীবীও গিয়েছেন বলে গুঞ্জন আছে। চার অফিশিয়ালের ঢাকা ছাড়ার বিমান টিকিটের একটি কপি এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। তাতে দেখা গেছে, বুধবার সকালে এমিরেটসের ইকে ৫৮৩ ফ্লাইটযোগে তারা প্রথমে দুবাই গেছেন। এরপর ইকে ০৮৫ ফ্লাইটযোগে গেছেন জুরিখে।

এমন লুকিয়ে কেন তারা জুরিখে? এ নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল বাফুফে বস কাজী সালাউদ্দিনের কাছে। উনি যেন কিছুই জানেন না এমন একটা ভাব করলেন। পরে অবশ্য বাফুফের নির্বাহী কমিটির শীর্ষ আরেক কর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারণটা জানিয়েছেন, ‘তারা চারজনই ব্যক্তিগতভাবে ছুটি নিয়েছেন। এটা বাফুফের কোনো অফিশিয়াল সফর নয়। আসল কারণটা অবশ্য আমার খুব বেশি জানা নেই। শুনেছিলাম, সোহাগসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ এনেছিল ফিফা। সেগুলোর ব্যাপারে হয়তো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের ডাকা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে যখন কোনো অভিযোগ তোলা হয়, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার একটা সুযোগ থাকে। সেটাই মনে হয় এরা করতে গেছে। তবে আমি যতটুকু জানি, এটা তাদের ব্যক্তিগত সফর।’

বেশ কিছুদিন ধরেই ফিফা বাফুফেতে তাদের প্রতিনিধি বসিয়ে অডিট প্রতিবেদনগুলো তদন্ত করছে। সেই তদন্ত করতে গিয়ে সোহাগসহ বেশ ক’জনের বিরুদ্ধে নানা অসংগতি খুঁজে পেয়েছে ফিফা। তাই তাদের দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিস। জানা গেছে, জুরিখের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগের রাতে অনেকটা সময় অফিসে ছিলেন সোহাগ। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত অফিসে থেকে কাগজপত্র গুছিয়েছেন বাকিদের নিয়ে। ফিফার কাছে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়তো সোহাগের এই গোপন সফর। তবে বাফুফের এক সহ-সভাপতি জানিয়েছেন, অনিয়ম যেই করুক, শেষ পর্যন্ত দায়টা এসে পড়ে নির্বাহী কমিটির ওপর। যার ফলে ফুটবল এগিয়ে নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে, ‘আমরা যারা নির্বাচিত হয়ে আসি ফুটবলকে সার্ভ করার জন্য, তারা খুব নিরুপায় হয়ে পড়ি, যখন দেখি কেউ আমাদের বিশ্বাস করছে না। স্পন্সররা বলে, ফুটবলে টাকা দিয়ে লাভ কী, সেগুলো তো সঠিক খাতে খরচ হবে না। ফলে তখন আমাদেরও বিপদে পড়তে হয়। আবার কেউ দোষ করলে তার দায়ও এসে পড়ে আমাদের ওপর। আমরা অনেকেই ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি’ এখানে। ব্যবসা-পরিবার ছেড়ে ফুটবলে সময় দিচ্ছি। কতদিন এটা করতে পারব, জানি না।’

বছরের শুরুতে এই ফিফার শোকজ নোটিস নিয়ে নাটক হয়েছে অনেক। তখন বাফুফে সভাপতি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানিয়েছেন, তার কিছুই জানা নেই।  সাধারণ সম্পাদকসহ চার কর্তার একসঙ্গে জুরিখ সফরের বিষয়টাও অজানা দাবি সভাপতি। তবে বেতনভুক্ত চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা পেয়ে গেলে ফিফা নিশ্চয় নিঃশর্ত ক্ষমার পথে হাঁটবে না। যদি একজনেরও শাস্তি হয় আর্থিক অনিয়ম কিংবা নকল বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার কারণে, সেই দায়টা কি এড়িয়ে যেতে পারবেন সালাউদ্দিন। তার নাকের ডগায় থেকেই যে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরা এতদিন চাকরি করে যাচ্ছেন মোটা বেতনে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত