বাংলা নয় বাংলাদেশি সিনেমা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০১:৩৭ এএম

আম্রিকার সিনেমা তো ইংরেজি ভাষার সিনেমাই, কিন্তু যদি ‘ইংলিশ সিনেমা’ বলেন, তাইলে কি আলাদা কইরা এর সিগনিফিকেন্সরে আপনি ধরতে পারবেন? মানে, ব্রিটিশ-সিনেমা, কানাডিয়ান সিনেমা, অইগুলাও তো ইংরেজি ভাষার সিনেমা। এই কারণে আম্রিকান সিনেমারে ‘ইংলিশ সিনেমা’ বলা হয় না নরমালি। কারণ তাইলে আম্রিকান সিনেমার ঘটনাটারে ঠিকমতো লোকেট করতে পারার কথা না। (এমনকি আম্রিকান সিনেমার মধ্যেও নানান জনরা তো আছেই, হলিউডি সিনেমার মধ্যেও।)

তো, টার্ম হিসেবে ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ এখনো চালু করতে পারি নাই আমরা, ‘বাংলা সিনেমা’ই লেখা হয়। তার মানে এইটা না যে, ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ বইলা ক্যাটাগরি নাই, বরং বাংলাদেশে সিনেমার আলাপগুলা এখনো ‘বাংলা সিনেমার’ বাইরে যাইতে পারে নাই। আর এইটা একটা ইচ্ছাকৃত ঘটনাই, এই ইল্যুশনটারে জিয়াইয়া রাখাটা। বাংলা ভাষার সিনেমা হইলেও ইন্ডিয়ান বাংলা সিনেমা ইন্ডিয়ান সিনেমাই, কিন্তু বাংলাদেশি সিনেমা ইন্ডিয়ার ‘আঞ্চলিক ভাষার’ কোনো সিনেমা না। সিনেমাটিক রিয়্যালিটি হিসেবেই ইন্ডিয়ান বাংলার সিনেমা থিকা আলাদা। মুশকিল হইতেছে এই জায়গাগুলা ক্লিয়ারলি মার্ক করা হয় না। এখন সংজ্ঞা দিয়া তো যেকোনো আর্টরেই বুঝতে পারব না আমরা, বরং এক ধরনের এটাচমেন্টের ভিতর দিয়া বোঝাবুঝির জায়গাতে রিচ করার ট্রাই করিতে পারি আমরা। কয়েকটা বাংলাদেশি সিনেমা দেইখা এইটা বেটার ফিল করা যাইতে পারে। আমার সাজেশন হইতেছে ইনিশিয়ালি এই ১০টা সিনেমা দিয়া শুরু করতে পারেন :রূপবানসালাহউদ্দিন (১৯৬৫)

নবাব সিরাজউদ্দৌলাখান আতাউর রহমান (১৯৬৭)

জীবন থেকে নেয়াজহির রায়হান (১৯৭০)

তিতাস একটি নদীর নামঋত্বিক ঘটক (১৯৭৩)

সুজন সখীখান আতাউর রহমান (১৯৭৫)

গোলাপী এখন ট্রেনেআমজাদ হোসেন (১৯৭৮)

ছুটির ঘণ্টাআজিজুর রহমান (১৯৮১)

বড় ভালো লোক ছিলমহিউদ্দিন (১৯৮২)

বেদের মেয়ে জোসনাতোজাম্মেল হক বকুল (১৯৮৯)

আম্মাজানকাজী হায়াৎ (১৯৯৯)

এইগুলা বাংলাদেশি সিনেমা, তবে এর বাইরেও অনেক সিনেমা আছে। এটলিস্ট ৫০-৬০টা সিনেমা তো আছেই, যেইগুলারে বাংলাদেশি সিনেমা বইলা আলাদা করতে পারবেন। এর শুরু হইতেছে ১৯৬৫ সালে ‘রূপবান’ সিনেমার ভিতর দিয়া। যেই কারণে বাংলাদেশি-সিনেমারে তখনকার আর্ট-মারানিরা বলতেন ‘যাত্রা-সিনেমা’! পরে বলছেন, ‘লোক-কাহিনীভিত্তিক সিনেমা’ ‘ফ্যান্টাসি সিনেমা’, অথচ জনরা হিসাবে এইটাই হইতেছে বাংলাদেশি সিনেমার পয়লা জিনিস, যেইটা সিগনিফিকেন্টলি ডিফরেন্ট। এমনকি পশ্চিম-পাকিস্তানে এই সিনেমাগুলার (রূপবান, সিরাজদ্দৌলা) উর্দু ভার্সন রিলিজ দেয়া হইছে এবং পরে ইন্ডিয়ান-বাংলাতেও (রঙিন রূপবান, বেদের মেয়ে জোসনা) রি-মেইক হইছে। তো, এইগুলা খালি ‘ফোক-সিনেমা’ না, বরং ফান্ডামেন্টালি ‘মিউজিক্যাল ফিল্ম’। বাংলাদেশি সিনেমার এইটা হইতেছে কোর জায়গাসিনেমার গান। কয়েকটা সুন্দর সুন্দর গান থাকতে হবেব্যাপারটা এই রকম না, বরং কাহিনীটা গানের ভিতর দিয়াই ঘটতে থাকবে, পুথিতে যেই রকম হয়, সুরের ভিতর দিয়া। এই রকমের জিনিস। যেইটারে লোকেট করা তো হয়-ই নাই, বরং এখনো পর্যন্ত ডিমরালাইজই করা হইতেছে। যে, ‘ভালো সিনেমা’ হইলে তো সেইখানে গান থাকতে পারে না! 

তো, এইটুকু বাংলাদেশি সিনেমা না। এইখানে অন্য আরও জনরা এবং সিগনেচারের ঘটনা আছে। কিন্তু কয়েকটা ভুল ধারণার কারণে এই জায়গাগুলা আমরা দেখতে পাই না বা দেখতে রাজি করাইতে পারি না নিজেদের।

কয়েকটা ভুল ধারণা

আর্টফিল্ম আর কমার্শিয়াল মুভি : সিনেমার দুনিয়া এই রকম দুইভাবে বিভক্ত না; কিন্তু বাংলাদেশে যেই সিনেমা-লিটারেচার আছে সেইখানে আলাপ আছে শুধু ‘আর্টফিল্ম’ নিয়া, ‘কমার্শিয়াল মুভি’ নিয়া আলাপ করা মোটামুটি ‘নিষিদ্ধ’। গত ১০-১২ বছর ধইরা ন্যাশনালিজমের জায়গা থিকা কিছু আলাপ শুরু হইছে, কিন্তু সেইটাও ঠিক সিনেমার আলাপ না, বরং সিনেমা যতটা ন্যাশনালিজমের এজেন্ডার লগে ফিট-ইন করে অই পেরিফেরিতেই আলাপগুলা ঘুরা-ফিরা করে। কিন্তু একটা আইডেন্টিটি-পলিটিক্সরে ফুয়েল দেয়াটা সিনেমার (আর্টের) কাজ না। আর এইটা বেশ ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্টই যে, বাংলাদেশে যেই ১৫-২০টা ‘আর্টফিল্ম’ বানানো হইছে, তার বেশির ভাগই ‘সরকারি অনুদানে’ বানানো সিনেমা।

মানে, ‘আর্টফিল্ম’ থার্ড-ক্লাস দর্শকরা দেখবে না, যদি মানুষ-জন বেশি দেইখা ফেলে তাইলে তো ‘আর্টফিল্ম’ হইতে পারবে না! এই কারণে সরকারি-টাকায় সিনেমা-বিপ্লব করার নিয়ম চালু আছে বাংলাদেশে। আর অই সিনেমাগুলাও মোটামুটি ইউরোপিয়ান, ইরানিয়ান, কোরিয়ান সিনেমার কপি-পেস্টই বেশির ভাগ সময়। যার ফলে এমন একটা বাংলাদেশি আর্টফিল্মের কথা বলতে পারবেন না, যেইটা ওয়ার্ল্ড-সিনেমার একটা ঘটনা হইয়া উঠতে পারছে। কারণ এইগুলা বেশির ভাগই (আইডিয়ার দিক দিয়া, সিনেমা-ধারণার দিক দিয়া) ‘নকল সিনেমা’।

তো, এইখানে আমার কথা হইতেছে, এই রকম (আর্টফিল্ম ও কমার্শিয়াল মুভি) ক্যাটাগরিগুলার বাইরে গিয়া আমাদের দেখতে পারতে হবে। এই রকম ভুল ক্যাটাগোরাইজেশনের কারণে বাংলাদেশের সিনেমার জায়গাগুলারে লোকেট করার জায়গাটাতে ব্যর্থ হয়া আছি আমরা।

কিন্তু তাই বইলা ঘটনাটা খালি এইটুকুই না যে, অনেক অনেক ভালো ভালো সিনেমা বানানো হইছে, যা আমরা জানি না! বরং খুব অল্প একটা সময়েই বাংলাদেশি সিনেমা বানানো হইছে আসলে। আর অই সময়টা হইতেছে ১৯৬৫-১৯৮৯, এই ২৫-২৬ বছরের ঘটনা। প্রিসাইজি বললে রূপবান (১৯৬৫) টু বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯)এই সময়টা হইতেছে ‘বাংলাদেশি সিনেমার’ সময়। এর আগেও কিছু সিনেমা বানানো হইছে, এবং সার্টেনলির পরেও ভালো কিছু সিনেমা বানানো হইছে, হইতেছে। কিন্তু গ্রসলি জায়গাটা আর একই রকম থাকে নাই। আর ‘অশ্লীল সিনেমার’ জোয়ারের কারণে এই ঘটনা ঘটে নাই।

(লেখার ভাষা ও বানান লেখকের নিজস্ব)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত