বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কনস্টেবল নিয়োগ ঘিরে সক্রিয় প্রতারক চক্র

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:১৮ এএম

প্রায় এক বছর পর পুলিশে সাড়ে ৫ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আর এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। কিছু ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে চেক ও খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর।

সম্প্রতি দুটি জেলা থেকে চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে খালি স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষর করা চেকের কপি। নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনাও রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতারকরা ১৫-১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দিচ্ছে চাকরিপ্রার্থীদের। এভাবে চক্রের সদস্যরা ১০-১২ জনের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থী আগাম টাকা দিতে রাজি না হলে তাদের কাছ থেকে স্ট্যাম্প ও চেক নিয়ে রাখছেন।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতারক ঠেকানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। কয়েক দিন আগে এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাঠে নামানো হয়েছে আইজিপির বিশেষ মনিটরিং সেলের সদস্যদের। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জানা গেছে, পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ তদবির-বাণিজ্য ঠেকাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশের সব কটি রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও পুলিশ সুপারদের কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন আইজিপি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একজন পুলিশ সুপার ও একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে তদারক টিম গঠন করা হয়। নিয়োগ পরীক্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিমগুলো দেশের ৬৪ জেলায় সফর করছে। আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করার নির্দেশনা দিয়ে সরকারি ফি ১০৩ টাকার বেশি কোনো প্রার্থীর কাছ থেকে না নিতে বলা হয়েছে।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে নানা অনিয়ম হয়ে থাকে প্রায়ই। ঘুষ লেনদেনই হয় বেশি। কনস্টেবল নিয়োগের অধিকর্তা হলেন জেলার পুলিশ সুপার। প্রায় প্রতিটি জেলায় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মন্ত্রী-এমপিসহ আমলাদেরও তদবির থাকে। তা ছাড়া এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যও নিয়োগে তদবির করেন। এই সবকিছুর নেপথ্যেই থাকে আর্থিক লেনদেন। অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতেই পুলিশ সদর দপ্তর কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও দেওয়া হয় বেশ কিছু নির্দেশনা। দালাল ও অসাধু চক্রের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার না হতে চাকরিপ্রত্যাশীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সচেতনতামূলক সংবাদ। কনস্টেবল নিয়োগ কার্যক্রম শুরুর আগেই আইজিপি সব রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের পুলিশ সদর দপ্তরে ডেকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কঠোর নির্দেশনা দেন।

নজরদারিতে দায়িত্ব পালন করে পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট, রেঞ্জ ডিআইজির নজরদারি কমিটি, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন পুলিশ সুপার (এসপি) ও একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে গঠিত ৬৪টি বিশেষ টিম।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘সারা দেশের ৬৪ জেলায় প্রথম ধাপে সাড়ে ৫ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিছু জেলায় আবেদন জমা পড়ছে। আর এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। তাদের বিষয়ে কাজ করছে গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে দুটি জেলায় কয়েকজন প্রতারক ধরা পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে পুলিশে চাকরি হয় না। যোগ্যতার নিরিখেই যোগ্য প্রার্থীরা চাকরি পাবেন। এ বিষয়ে আইজিপি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮ সালে ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে নিয়োগে রাজনীতিবিদরা কোটার জন্য পুলিশ সুপারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। বিষয়টি গোপন প্রতিবেদনের মাধ্যমে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছালে সেই নিয়োগ-প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। চলতি বছরের শুরুতে সারা দেশে সাড়ে ৫ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কোন জেলায় কতজন নিয়োগ পাবেন এবং আবেদেন প্রক্রিয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কোনো কোনো জেলায় প্রার্থীর সংখ্যা ১০ হাজারও ছাড়িয়েছে। ধাপে ধাপে সব জেলায় নিয়োগ শেষ করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতারক চক্রের সদস্যরা খুব চতুর। তারা ১০-১২ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রাখে। এর মধ্যে যদি কেউ যোগ্যতার ভিত্তিতে টিকে যান তাহলে তাকে বলা হয়, ‘অমুক স্যারের মাধ্যমে তোমার চাকরিটা হয়েছে। এখন বাকি টাকা পরিশোধ করো, না হলে বাদ পড়ে যাবা।’ তখন না বুঝেই অনেকে টাকা দিয়ে দেন। বিষয়টা অনেকটা ঝড়ে বক পড়ার মতো অবস্থা। তিনি বলেন, এ ধরনের একাধিক চক্র বিভিন্ন সময় সক্রিয় থাকে। তাদের তালিকাও রয়েছে। তাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তালিকায় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও পুলিশের আত্মীয় পরিচয়দানকারী লোকজনও রয়েছেন।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, প্রতারণার জন্য ইতিমধ্যে চাঁদপুর জেলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষার সময় একজনকে ধরা হয়েছে। সে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের কথা আমাদের কাছে স্বীকার করেছে। 

মাদারীপুর পুলিশ সুপার মাসুদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর পুলিশ লাইনস মাঠে রিক্রুট কনস্টেবল নিয়োগের মাঠপর্যায়ে শারীরিক মাপ ও কাগজপত্র বাছাই পরীক্ষা হয়। এ সময় তারা জানতে পারেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা মাদারীপুর পোস্ট অফিসের সামনে টাকা লেনদেন করছে। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সাকিব আকন নামে এক চাকরিপ্রত্যাশীর পরিবারের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা নিচ্ছে তারা। বিষয়টি জানান পর তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে সদর উপজেলার ব্রাহ্মন্দী গ্রামের ইউনুস আলী বেপারি ও হোগলপাতিয়া গ্রামের রিপন হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। প্রাথমিকভাবে তারা অবৈধ টাকার বিনিময়ে চাকরির প্রলোভন দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এর আগেও তারা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে অবৈধ লেনদেন করেছে বলেও জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এবার মাদারীপুর জেলায় ৪৫ জন কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। তারই ফলে প্রতারকদের আটক করতে সক্ষম হয়েছেন।

জানা গেছে, মাদারীপুরের ঘটনার পর ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তারা হলেন রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার দাশপুকুর মহল্লার মারুফ শাহরিয়ার, বরিশাল সদরের মঙ্গলহাটা এলাকার শাহাদত হোসেন ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চাতৈনভিটি গ্রামের আব্দুল আজিজ। তাদের কাছ থেকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে নেওয়া ৩২টি স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেকবই, প্রায় ৫৬ লাখ টাকার অঙ্ক বসানো স্বাক্ষর করা ১০টি চেক, ৫০টি স্বাক্ষর করা ফাঁকা নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, তিনটি স্মার্ট মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।

এ বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, সারা দেশে এখন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতারক চক্রটি প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল। বিষয়টি জানতে পেরে এদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা এখনো চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়নি। কিন্তু ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নিয়েছে স্বাক্ষর করিয়ে। এই ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প দিয়ে জিম্মি করে পরে টাকা আদায় ছিল তাদের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, রাজশাহীতে কনস্টেবল পদে আবেদন পড়েছিল ১৮ হাজার। এর মধ্যে শারীরিক পরীক্ষার জন্য ডাক পড়েছিল সাড়ে ৩ হাজার জনের। সাতটি পর্বে শারীরিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে তাদের। এতে উত্তীর্ণরা ১৫ ফেব্রুয়ারি লিখিত পরীক্ষা দিয়েছে। এরপর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। এত সব পরীক্ষার পর যোগ্য প্রার্থীদেরই চাকরি দেওয়া হবে। কোনো তদবির কাজে আসবে না।

তিনি বলেন, ডিবি পুলিশ প্রথমে মারুফ শাহরিয়ারকে আটক করে। তার মেস থেকে দুটি চেক, ৫৩টি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও একটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের আরেক সদস্য শাহাদত হোসেনকে আটক করা হয়। তার ভাড়া বাসা থেকে ২০টি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ২০টি চেক ও একটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়। পরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বাড়ি থেকে চক্রের আরেক সদস্য আজিজকে আটক করা হয়। তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় ২৭টি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ২০টি চেক, একটি মোবাইল ফোন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত