প্রতারণার বাহারি কৌশল

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:৪০ পিএম

সরকারি চাকরি পেতে ঘুষ লাগে। এটা নতুন কিছু না। সবাই জানে, টাকা না ঢাললে সরকারি চাকরি হয় না।  বহু বছর ধরে, আমাদের দেশে এই অবৈধ বাণিজ্য চলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই  টাকা মূলত খায় কে? এর সঙ্গে জড়িত কারা? বিষয়টা এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, খোদ ‘পুলিশ কনস্টেবল’ নিয়োগের ক্ষেত্রেও টাকা খাওয়াতে হবে। শুধুমাত্র প্রতারক চক্রের পক্ষে, এমন কাজ করা কঠিন অনেকটা দুঃসাধ্য। তাহলে? সহজেই বোঝা যায়, নিশ্চয়ই পুলিশেরই এমন কিছু কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত, যারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। শুধুমাত্র প্রতারক চক্রের ওপর দোষ চাপিয়ে, বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

গতকাল দেশ রূপান্তরের শেষ পাতায় প্রকাশিত ‘কনস্টেবল নিয়োগ ঘিরে সক্রিয় প্রতারক চক্র’ শিরোনামের সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়, এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘দেশের ৬৪ জেলায় প্রথম ধাপে সাড়ে ৫ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিছু জেলায় আবেদন জমা পড়ছে। আর এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। তাদের বিষয়ে কাজ করছে গোয়েন্দারা।

ইতিমধ্যে দুটি জেলায় কয়েকজন প্রতারক ধরা পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে পুলিশে চাকরি হয় না। যোগ্যতার নিরিখেই যোগ্য প্রার্থীরা চাকরি পাবেন। এ বিষয়ে আইজিপি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। কয়েক দিন আগে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাঠে নামানো হয়েছে আইজিপির বিশেষ মনিটরিং সেলের সদস্যদের। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

সংবাদে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি দুটি জেলা থেকে চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে খালি স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষর করা চেকের কপি। নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনাও রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতারকরা ১৫-১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দিচ্ছে চাকরিপ্রার্থীদের। এভাবে চক্রের সদস্যরা ১০-১২ জনের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থী আগাম টাকা দিতে রাজি না হলে তাদের কাছ থেকে স্ট্যাম্প ও চেক নিয়ে রাখছেন। দালাল ও অসাধু চক্রের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার না হতে চাকরিপ্রত্যাশীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সচেতনতামূলক সংবাদ।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতারক চক্রের, বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আশা করা যায়, আরও ধরা পড়বে। কিন্তু এমন ভয়ংকর প্রতারণার মাস্টারমাইন্ড কি থেকে যাবেন ধরাছোঁয়ার বাইরে? 

মনে হচ্ছে, কোথাও আলো নেই। এক অদ্ভুত অন্ধকার গ্রাস করছে, সমাজকে। ভয়ংকর লোভ আর আত্মকেন্দ্রিকতায় ছেয়ে যাচ্ছে আমাদের বিবেক। স্বর্ণলতার মতোন পরগাছা, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে চৈতন্য। সেখানে কোনো সততা নেই, মানবিকতা নেই, মানুষের প্রতি ভালোবাসা নেই। এমন আত্মঘাতী সমাজচিত্র কে, কবে দেখেছে আমাদের জানা নেই। তবে, এটাই এখন বাস্তবতা।

তবে, এই বাস্তবতাকে সহজে মেনে নেওয়া যাবে না। এর বিরুদ্ধে জেগে উঠতে হবে। প্রবল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, এইসব দুর্নীতি-অপরাধের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করা দরকার। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার দায়িত্ব যে বাহিনীর হাতে থাকবে সেখানেই যদি এই ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রতারণার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দুর্নীতি-অপরাধের শেকড় প্রোথিত হয়েছে। দীর্ঘ সময়ে এর গোড়া, যথেষ্ট শক্ত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই প্রতারক চক্রকে সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত