করোনা মহামারির ক্ষতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সংকটে ব্যয় বৃদ্ধিসহ ২০২২ সালে নানা সংকটে কেটেছে দেশের শিল্প খাত। এ জন্য শিল্পে উৎপাদন ঠিক রাখতে নানা সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবুও বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা। তবে আশার দিক হচ্ছে, বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে খেলাপি বাড়ার পর শেষ প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া শর্তের কারণে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য চলছে, বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর ২০২১ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা, যা ছিল সে সময়ের মোট ঋণের ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ; অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।
তবে খেলাপির এই পরিমাণ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও বেশি ছিল। সে সময় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা ছিল খেলাপি ঋণ। বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা কমে যায়। তবে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণের খেলাপি কমে যাওয়ার তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীবিদরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রান্তিক অনুযায়ী খেলাপি কমলেও বছর হিসেবে বেড়েছে ১৭ হাজার কোটিরও বেশি। সুতরাং এটা খুব বেশি উল্লেখযোগ্য কিছু না। আর এক কথায় কাগুজে হিসাব। বাস্তবে খেলাপি ঋণের কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। মূলত আইএমএফকে দেখানোর জন্যই একটা গাণিতিক হিসাব দেখানো হয়েছে। যদি পুনঃতফসিল আর অবলোপন বাড়ে তাহলে খেলাপির উন্নতি কীভাবে হলোÑ এমন প্রশ্ন রাখেন এই অর্থনীতিবিদ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের যে সংজ্ঞা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এই সময়ে কী পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে, আদালতের আদেশে ঋণের কী পরিমাণ অর্থ আটকে আছে, আর কী পরিমাণ অবলোপন করা হয়েছে, তা দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে হিসাব দেখাচ্ছে প্রকৃত খেলাপি তার চেয়ে অনেক বেশি। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকও তাদের মতামত দিয়েছে।
আইএমএফকে দেখানোর জন্য কমিয়ে দেখানো হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আইএমএফকে মুখে হিসাব দেখালেই তো চলবে না। তারা খেলাপি ঋণের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইবে। এই সময়ে যদি পুনঃতফসিল, অবলোপন বা কোর্টে আটকা পড়া ঋণের পরিমাণ বাড়ে, তাহলে বুঝতে হবে বাস্তবে খেলাপি ঋণ কমেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণ কমেছে ১৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতি কমেছে ২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণের পরিমাণ ৮৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১ লাখ ৬ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১১ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। মন্দ ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম বলে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার বিধান রয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৬ দশমিক ৭৯ শতাংশই সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। এসব ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ ৫৬ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ২০ দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ আন্তর্জাতিক মানদ-ে খেলাপির পরিমাণ ৩ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। সরকারকে আইএমএফের ঋণের সব কিস্তি পেতে হলে ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৫ শতাংশের নিচে হতে হবে।
২০২২ সালে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা, যা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ সময়ে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের ব্যাংক খাতের প্রভিশন সংরক্ষণের কথা ছিল ৮৪ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে ৭৩ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। আর ঘাটতি রয়েছে ১১ হাজার ৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঘাটতি ৮ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা; অর্থাৎ মোট প্রভিশন ঘাটতি ৮০ শতাংশই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর।
আবদুর রউফ তালকদার বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে খেলাপিদের বড় ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও শ্রেণিকৃত ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার যুক্তি দেখিয়ে এই ছাড় দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে এখন আড়াই থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই চলবে। আগে যা ছিল ১০ থেকে ৩০ শতাংশ। এসব ঋণ পরিশোধ করা যাবে ৫ থেকে ৮ বছরে। আগে এ ধরনের ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ দুই বছর সময় দেওয়া হতো।
