আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যা বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আর ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের জন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি। গতকাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এই অর্থ চেয়ে বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচনপরবর্তী উপনির্বাচন, প্রায় ৪০০ উপজেলা নির্বাচনসহ কমিশনের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খাতে খরচের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা, ইসির প্রতিনিধিদল ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে ইসির চাওয়া বাজেট গ্রহণ না করে কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে তা আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদের তুলনায় এবার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৩৫ শতাংশ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। আর এবার চাওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি ৪০ লাখ ৫ হাজার টাকা। শুধু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যই চাওয়া হয়েছিল ৬০০ কোটি টাকা। এবার নির্বাচনের জন্য চাওয়া হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকার কিছু ওপরে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈঠকটি ত্রিপক্ষীয় ছিল। আমাদের প্রতিনিধিদল ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা ছিলেন। আমরা যে রেগুলার বৈঠক করি, এটাও তেমনি ছিল। আগামী ২০২২-২৩ অর্থ বছরের জন্য আমরা অর্থ চেয়েছি। তারা সেটি রিভিউ করে আবার জমা দিতে বলেছেন। আগামী মাসে সেটি আবার বৈঠকে ওঠানো হবে।’
ইসি সূত্র জানিয়েছে, ১ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ রাখা হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার জন্য। নির্বাচনী সব ধরনের উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে কাগজের দাম ও মুদ্রণ খরচ বাড়ার কারণে ব্যালট পেপার ও অন্যান্য কাগজপত্র ছাপানো খরচ বেড়েছে। অমোচনীয় কালি আমদানি, বুথ স্থাপন, নির্বাচনী কাজে সংশ্লিষ্টদের খরচও বেড়েছে। এ ছাড়াও ৩০০ আসনে নির্বাচন হলেও হিসেব দেওয়া হয়েছে ৩২৫টি আসনের খরচ। কেননা, একাধিক প্রার্থী দুটি বা তিনটি আসনে নির্বাচন করেন। আবার এসব প্রার্থীর ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের জন্য ২৯টি খাতকে সম্ভাব্য হিসেবে ধরা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা খাতের খতিয়ান বড় হলেও সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায়। খাতওয়ারি অর্থ বরাদ্দের হার বিগত নির্বাচনের চেয়ে দ্বিগুণ বা অনেক ক্ষেত্রে তিনগুণ ও চারগুণ করা হয়েছে। সম্ভাব্য খাতগুলোর মধ্যে আরও রয়েছেÑ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং এবং পোলিং অফিসার), স্থায়ী ও অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র স্থাপন, প্রতি কেন্দ্রের মনিহারি দ্রব্য, মালামাল পরিবহন, রিটার্নিং অফিসারের ডাক, ফ্যাক্স ও আপ্যায়ন খরচ, সহকারী রিটার্নিং অফিসারের ডাক, ফ্যাক্স ও আপ্যায়ন খরচ এবং রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের যাতায়াত বাবদ ব্যয়। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পারিশ্রমিক বেড়ে যাওয়ায় তার অনুপাতে প্রতিবারই নির্বাচনী ব্যয় বাড়ছে। ভোটগ্রহণে যতজন নির্বাচনী কর্মকর্তা লাগে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োগও দিতে হয়। এ কারণে পুরো নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় আইনশৃঙ্খলা খাতে।
জানা গেছে, ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি ৪০ লাখ ৫ হাজার টাকার মধ্যে ইসির বেতন-ভাতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, ৪০০ উপজেলা নির্বাচন, ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদ, স্থানীয় সরকারের সাধারণ ও উপনির্বাচন, উন্নতমানের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই অব্যাহত এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন কার্যক্রম খাতসহ অন্যান্য ব্যয় রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের বাজেট ছিল ৯৫৩ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে ইসির বরাদ্দ ছিল ৮৪৯ কোটি টাকা। শুধু নির্বাচন আয়োজনের জন্য অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সময় প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা এবং দশম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় ভোট হয় ১৪৬ আসনে। ফলে ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৩০০ কোটি, যার মধ্যে ব্যয় হয় ২৯২ কোটি টাকা।
