দরিদ্রদের আর্তনাদ ছাড়া কোনো ভাষা নেই

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:৪২ পিএম

বাংলাদেশের বিগত ছেচল্লিশ বছরের ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন স্বৈরশাসনের ইতিহাস। এই স্বৈরশাসন কখনো ছিল নির্বাচিত, কখনো অনির্বাচিত; তফাৎ ওইটুকুই। রাষ্ট্র ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে, বিশেষ ক্ষমতা আইন এসেছে, এসেছে জননিরাপত্তা নামক নিপীড়নের হরেক আইন। ওই জননিরাপত্তা আইন রাষ্ট্রের চরিত্রটিকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। এই আইন জনগণকে পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের হাতে তুলে দেবে; আর ক্ষমতা পেয়ে ওই দুই প্রতিষ্ঠান ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গ টাউটরা জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়ন করবে, তোলা তুলবে। আগেও তুলত, কখনো থামায়নি, কিন্তু এখন তুলতে পারবে আরও সহজে, একবারে বৈধভাবে, ধরে এনে, কিংবা ধরে এনে জামিনের অযোগ্য করে কারাগারে মাসের পর মাস বন্দি করে রাখবার হুমকি দিয়ে। এই রাষ্ট্র বস্তিবাসীকে উৎখাত করে; বলে, সন্দেহ হচ্ছে তোমরা খাঁটি সন্ত্রাসী, কিন্তু শেয়ার বাজার, উন্নয়নের অর্থ আত্মসাৎকারী, ব্যাংক লুটকারী প্রকৃত ও খুনের মামলার আসামি যে সন্ত্রাসী তাকে সে পাহারা দেয়। এই রাষ্ট্র হুঙ্কারের, ধমকের ও হুকুমের; এর ভাষা জনগণের ভাষা, অর্থাৎ বাংলা ভাষা হবে, এ-সম্ভাবনা বহুভাবেই ক্ষীণ।

স্বাধীনতার পরে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা ইংরেজিবিরোধী ছিল না, বরং ইংরেজির দিকেই ঝুঁকে পড়েছিল। কেননা, ক্ষমতায় এসেছে মধ্যবিত্ত, যে-মধ্যবিত্ত পুঁজিবাদকেই আদর্শ মনে করে, এবং শ্রেণিগতভাবে যারা মোটেই উপনিবেশবাদের বিরোধী নয়। এরা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পছন্দ করে। কেননা, আমলাতন্ত্র এদের নিয়েই গঠিত। পুঁজিবাদে এদের সুবিধা, কারণ ওই পথেই ধনী হওয়ার সম্ভাবনা। পরের নেতৃত্ব আগের নেতৃত্বকে ছাড়িয়ে গেছে এক ব্যাপারে, সেটা হলো পুঁজিবাদের জন্য পথ প্রশস্তকরণ। আর ওই বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভাষা তো বাংলা নয়, তার ভাষা হচ্ছে ইংরেজি।

অর্থনৈতিকভাবে আমাদের রাষ্ট্র মোটেই স্বাবলম্বী নয়, বরং তার পরনির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। ঋণ-সাহায্য এনজিও তৎপরতা, সবই রয়েছে পুরোদমে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারিত হয় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফ-এর নির্দেশ অনুযায়ী, এদের ভাষা বাংলা নয়। বাঙালি এখন জীবিকান্বেষণে ও শিক্ষালাভের আশায় বিদেশে যেতে পারলে যত খুশি হয়, তত খুশি কম জিনিসেই হয়ে থাকে। এজন্য তাকে ইংরেজি শিখতে হয়।

দেশের ভেতরে ধনীগৃহের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমেই পড়াশোনা করে। ঢাকা শহর এখন ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার চেয়ে কম যায় না, ইংরেজি শিক্ষার উন্মাদনায়। বাংলাদেশে তেল, গ্যাস, কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে; এই সৌভাগ্য তার জন্য দুর্ভোগের কারণ হবে বলে আশঙ্কা, কেননা নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে, এই সম্পদ দখল করার অভিপ্রায়ে। একাত্তরে আমেরিকা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোরতর বিরোধী, স্বাধীনতার পরে সেই আমেরিকাই হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির প্রধান ভরসা।

আসল সত্য এই যে, বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি অন্য কিছু দেখে না, নিজেদের স্বার্থ ছাড়া। বাংলাদেশের বাজার তারা বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করছে এবং দেশে সম্পদ যা আছে তাও বিদেশিদের হাতে নির্বিচারে ও সোৎসাহে তুলে দিচ্ছে। শাসকশ্রেণির একাংশ বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, অন্য অংশ বলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তাদের ধ্বনি একেবারেই অভিন্ন; সেক্ষেত্রে কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, আর কে নয়, তা নিরূপণ করা একেবারেই অসম্ভব। বোঝা যাচ্ছে, রাষ্ট্র কথা বলছে তার নিজের ভাষায়, জনগণের স্বার্থের যে ভাষা, অর্থাৎ বাংলাভাষা, সে-ভাষায় নয়।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাভাষার অবস্থা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। দেশে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে। এ-শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই যে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাবে তা নয়, অনেকেই দেশে থেকে যাবে এবং আগামী দিনে আমলাতন্ত্রের উচ্চতর স্তরে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, বিভিন্ন পেশায় এবং রাজনীতিতেও এরা নেতৃত্ব দেবে। ওই নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনই ইংরেজি-মিশ্রিত বাংলায় কথা বলে, ভবিষ্যতে মিশ্রণটা থাকবে না, ইংরেজিতেই কথা বলতে পছন্দ করবে। এবং যারা পারবে না তারা নিজেদের হীনজ্ঞান করা শুরু করবে। বাংলা মাধ্যমে স্কুলগুলোই অবশ্য শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধান ধারা। কিন্তু এই ধারা ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষাকে জোরদার করা হচ্ছে। এই ধারায় বাংলাভাষা চর্চা কম, এবং এখানে যারা শিক্ষিত হচ্ছে পরবর্তীকালে তারা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, রাষ্ট্রকে আরও দক্ষিণ দিকে ঠেলে দিতে চাইবে, এমন আশঙ্কা মোটেই অমূলক নয়।

আসলে মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করা আর গরিব মানুষকে আরও গরিব করার চেষ্টা যে রাষ্ট্রীয় অভিপ্রায়, তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বরং বলা যায় এরা একই সূত্রে গ্রথিত। গরিবের সন্তানই মাদ্রাসায় পড়ে, এবং পরবর্তী জীবনে জীবন-সংগ্রামে ব্যর্থ হয়ে এরা আরও গরিব হবে। কেননা, তাদের শিক্ষার কোনো অর্থনৈতিক মূল্য তারা দেখতে পাবে না, ধর্মীয় কাজে আর ক’জনের কর্মসংস্থান হবে? শিক্ষাক্ষেত্রে এই যে বৈষম্য একে অস্বাভাবিক বলবার কোনো উপায় নেই। বরং বলতে হবে যে এটাই স্বাভাবিক। কারণ সমাজে বৈষম্য রয়েছে। এবং রাষ্ট্র সেই বৈষম্যকে মহোৎসাহে বিকশিত করছে ও কায়মনোবাক্যে পাহারা দিচ্ছে, এবং সেই বৈষম্যই স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে এসেছে শিক্ষাব্যবস্থাতে।

উচ্চতর শিক্ষায় বাংলাভাষা চালু করা হবে বলে আশা করা হয়েছিল। সেই আশা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। এর কারণও ওই একই। যে-রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা নয়, সেই রাষ্ট্র উচ্চশিক্ষায় বাংলা প্রচলনের জন্য চেষ্টা করবে কেন? নির্মম সত্য এই যে, উচ্চবিত্তদের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষা ইংরেজিতেই লাভ করবে বলে আশা রাখে। কেউ কেউ বিদেশেই যাবে। ওই উদ্দেশ্যে যারা যাবে না তারাও ব্যক্তিমালিকানাধীন তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো বটে এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ইংরেজির মাধ্যমেই শিক্ষিত হবে। উচ্চবিত্তরাই সমাজের নেতা, তারাই আদর্শ, অন্যরাও তাদের পথেই চলতে চাইবে, চলতে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার দুঃখে কপাল ঠুকবে।

বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি লোকের বাস। সারা বিশ্বে বাংলাভাষীর সংখ্যা বিপুল, বাংলাভাষায় উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা কোনো অসম্ভব কাজ ছিল না। তার জন্য প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্দীপনা ও বিনিয়োগের। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন বই লেখার, বাইরের বিশ্বে যা লেখা হচ্ছে সেগুলো অনুবাদ করার। কাজটা প্রকৃত অর্থে বলতে গেলে শুরুই হয়নি; যে জন্য এখন বাংলা ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে অর্থনীতি। মধ্যবিত্তের একাংশ নিম্নমধ্যবিত্তে পরিণত হয়েছে, নিম্নমধ্যবিত্ত আরও নিচে নেমেছে, প্রান্তিক কৃষক পরিণত হয়েছে ভূমিহীনে, ভূমিহীন হয়ে পড়েছে ভিটাহীন। সবকিছুই ঘটেছে উন্নতির অন্তরালে। বস্তুত উন্নতির প্রচণ্ড চাপের কারণেই। এই যে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ, এদের জীবনে কোনো ভাষা নেই, নীরব ক্রন্দন ও আর্তনাদ ছাড়া। রাষ্ট্রভাষা থেকে এরা অনেক দূরে, রাষ্ট্রের ভাষা থেকে তো অবশ্যই। রাষ্ট্রের ভাষা এদের সন্ত্রস্ত রাখে এবং রাষ্ট্রভাষার চর্চা যে করবে, তেমন সুযোগ এরা পায় না।

আমাদের দেশে সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম হচ্ছে টেলিভিশন; টেলিভিশন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে, রাষ্ট্রের শাসন কর্তৃত্বে পরিবর্তন ঘটে, একদল যায় আরেক দল আসে, কিন্তু টেলিভিশনের ভাষা সেই একই থাকে, সেটি রাষ্ট্রের ভাষা, অর্থাৎ শাসকশ্রেণির ভাষা। শাসকশ্রেণি তাদের মাহাত্ম্যের কথা বলতে থাকে। একবার এ দল বলে আরেকবার বলে অন্য দল। সংবাদপত্রগুলোও শাসকশ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বটে; হয় এ দলের নয় তো ও-দলের, যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তাদের কর্তৃত্ব বাড়ে, স্বভাবতই।

রাষ্ট্রের আদর্শ পুঁজিবাদী, কিন্তু এই রাষ্ট্রে আবার সামন্তবাদকেও উৎসাহিত করে, নিজের স্বার্থে। ধর্মকে নিয়ে আসে রাজনীতিতে। এর একটা কারণ, রাষ্ট্রের যারা শাসক তারা স্থূল অর্থে বস্তুতান্ত্রিক অবশ্যই, যা পায় তাই খায়, কিন্তু দার্শনিক অর্থে ইহজাগতিক নয়, পরকালের কথা ভাবে এবং ইহকালে যেসব সুখ-সুবিধা পাচ্ছে সেগুলো পরকালেও পাবে, পেতেই থাকবে, এই আশাতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অন্যদিকে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য আবার ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান ও সান্ত¡না সরবরাহ করা হয়। আজকের বাংলাদেশে বড় দু’দলের কোনোটিই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করে না। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল, বিএনপি তাকে সরিয়ে দিয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তারা যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনঃস্থাপিত করেনি বরং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানভুক্ত করেছে।

কী করতে হবে আমরা জানি। রাষ্ট্রকে জনগণের সম্পত্তি ও অবলম্বনে পরিণত করতে হবে, অর্থাৎ তাকে গণতান্ত্রিক করার দরকার হবে, প্রকৃত অর্থে। সেটা যখন সম্ভব হবে তখন রাষ্ট্রের ভাষা এবং রাষ্ট্রভাষার মধ্যকার ব্যবধান দূর হবে; বাংলা হবে রাষ্ট্রের ভাষা, সর্বস্তরে তা চালু থাকবে। এই ভাষায় সৃষ্টিশীল কাজ হবে। বিশ্বের মানুষ একে মর্যাদা দেবে। জনগণের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আসবে। রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই তো আমরা আন্দোলন করেছি উনিশ শ’ বায়ান্নতে এবং একাত্তরে। একই আন্দোলন। আজ যে দেশে এত হতাশা তার কারণ ওই আন্দোলন এখন নেই। অথচ তার খুবই প্রয়োজন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিদ্যমান রাজনীতির প্রধান দুটি ধারা, যারা আসলে একই ধারা, তারা এই আন্দোলন করবে না। নতুন রাজনৈতিক ধারা দরকার হবে, সেই ধারা গণতান্ত্রিক হবে, অর্থাৎ তাকে বাম দিকের হতে হবে, ডান দিকের না-হয়ে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত