চট্টগ্রামের আবাসন শিল্পে ২০০৫ সালে সূর্যোদয়ের মতো আবির্ভূত হয় সিপিডিএল। নন্দনকাননে নন্দন ভ্যালি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নগরীর প্রাণকেন্দ্র জামালখানে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে থাকে। তখনকার সময়ে আবাসন খাতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত ছিল না। কিন্তু সিপিডিএল নির্ধারিত সময়ের আগে প্রকল্প হস্তান্তরের চর্চা চালু করে। এ কারণে ভূমি মালিকদের অনেকে যেমন সিপিডিএলের কাছে ছুটে আসে তেমনি ফ্ল্যাট ক্রেতাদেরও পছন্দের শীর্ষে পৌঁছে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
ক্রেতাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে করতে জামালখান, মেহেদীবাগ, খুলশী, পাথরঘাটা, নন্দনকানন, দেবপাহাড়, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, ফয়’স লেকসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প নিয়েছে। পাশাপাশি নগরীর বাইরে আনোয়ারায় স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার উদ্যোগও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু কি আনোয়ারা? চট্টগ্রামের গ-ি পেরিয়ে এখন ঢাকায়ও সদর্পে এগিয়ে চলছে সিপিডিএল। ২০২০ সালে ঢাকায় প্রকল্প নেওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে ছয়টির কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
জামালখান এলাকায় সবচেয়ে বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও নগরীর মেহেদীবাগে তারা সর্বপ্রথম বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ করে। ‘ক্রিমসন ক্লোভার’ নামের একটি কনডোমিনিয়াম প্রকল্পে প্রতিটি ফ্ল্যাটের সর্বনিম্ন আয়তন ছিল দুই হাজার বর্গফুটের ওপরে এবং সেটিতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেকটাই যুক্ত করায় অনেকের কাছে এখনো তা ঈর্ষণীয় প্রকল্প। আর এরই ধারাবাহিকতায় আরও বড় আকারে নগরের দেবপাহাড় এলাকায় পাহাড় ও সমতলের সংমিশ্রণে নেওয়া হয়েছে ‘সিপিডিএল সুলতানা গার্ডেনিয়া’ নামের একটি প্রকল্প। চার টাওয়ারের সেই প্রকল্পে রয়েছে ১৩৬০ থেকে ২৪৩৫ বর্গফুট সাইজের ১৫৫টি ফ্ল্যাট। গত ১৮ বছরে চট্টগ্রামে ২৬টি প্রকল্পের কাজ শেষ করেছে, বর্তমানে চলমান রয়েছে আরও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ।
চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের বাইরের মানুষদেরও আমরা সেবা দিতে চাই। আমরা আমাদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে চাই। এখন ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দুটি, উত্তরায় দুটি, পুরানা পল্টনে একটি এবং আমেরিকান এমবাসিসংলগ্ন বারিধারায় একটি অত্যাধুনিক কনডোমিনিয়াম প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আগামীতে কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় গ্রোথ সেন্টারভিত্তিক প্রকল্প নিতে চাই।’
ফ্ল্যাট শুধু একটি ঘর নয়, বসবাসের সব উপকরণের সংযুক্তি মানেই ফ্ল্যাট। আবাসন শিল্পে এ ধারার সঙ্গে নগরবাসীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সিপিডিএল যেখানে প্রকল্প নেয় সেই এলাকার পরিবেশও বদলে ফেলে। নান্দনিক চট্টগ্রাম সেøাগানে সর্বপ্রথম জামালখান এলাকায় সবুজ ও নান্দনিকের মিশ্রণ ঘটিয়ে সবুজায়ন কার্যক্রম শুরু করেছিল সিপিডিএল। আর এরই ধারাবাহিকতায় পরে পুরো নগরে ফুটপাত ও রোড ডিভাইডারে সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প নিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া দেবপাহাড় এলাকায় সুলতানা গার্ডেনিয়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এলাকায় প্রবেশপথ থেকে শুরু করে পুরো এলাকার আউটলুকে পরিবর্তন এনেছে সিপিডিএল। এর আগে দক্ষিণ খুলশী এক নম্বর রোডে ‘বেলা দিস্তা’ প্রকল্পের জন্য পুরো একটি সড়ক নিজ খরচে করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ শুধু ফ্ল্যাট তৈরি এবং তা হস্তান্তর নয়, পুরো এলাকা নিয়ে কাজ করে তারা।
এ বিষয়ে সিপিডিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘আমরা শুধু একটি ফ্ল্যাট নয়। এ ফ্ল্যাটে বসবাসকারী প্রতিটি বয়স গ্রুপের নাগরিকদের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন ফিচার যুক্ত করে থাকি। যেমন শিশুদের জন্য কিডস জোন, বয়স্কদের জন্য বই পড়া কিংবা গল্প করার স্থান, জিম সুবিধা, ইয়োগা, হাঁটার জন্য ওয়াকওয়ে সব ফ্যাসিলিটি যুক্ত করা হয় আমাদের প্রকল্পে। একই সঙ্গে যে এলাকায় প্রকল্পটি নেওয়া হয় সেই এলাকাটিকে দৃষ্টিনন্দন করতেও প্রকল্প নেওয়া হয়। জামালখান, দেবপাহাড় ও খুলশীতে যেমনভাবে করা হয়েছে তেমনিভাবে অন্যান্য সব প্রকল্পে করা হচ্ছে।’
শুধু ফ্ল্যাট নয়, সিপিডিএল রেডি অফিস অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির ধারণাও যুক্ত করেছে নগরীতে। নগরীর খুলশীতে রহিমস প্লাজায় স্টুডিও অফিস চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন এ ধারণা প্রসঙ্গে সিপিডিএলের চিফ বিজনেস অফিসার জিয়াউল হক খান বলেন, ‘বর্তমান সময়ে একটি অফিস কম্পাউন্ডের কনফারেন্স রুমসহ অন্যান্য অনেক রুম অপ্রয়োজনীয় অবস্থায় পড়ে থাকে। তাই আমরা একটি অফিস কনফারেন্স রুমকে কেন্দ্র করে একাধিক স্টুডিও অফিস করেছি। এতে শিডিউলের ভিত্তিতে কনফারেন্স রুম ব্যবহার করা যায়। আবার একটি ফ্রন্ট ডেস্ক রেখে একাধিক অফিস পরিচালনা করা সম্ভব। আর্থিকভাবেও তা সাশ্রয়ী।’
আবাসিক ফ্ল্যাটের পাশাপাশি সিপিডিএল সেকেন্ড হোম কনসেপ্টও চালু করেছে নগরীতে। নগরীর ফয়’স লেকে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের আদলে চালু করেছে সেকেন্ড হোম। এতে বিনিয়োগকারীরা একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট কিনে পাঁচ তারকা হোটেলের সুবিধা নিয়ে থাকতে পারবে। ব্যবসায়িক কাজে চট্টগ্রামে এলে এখানে থাকার সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে কেউ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কিনলে মাসিক ভাড়াও পাবে। মূলত মিরসরাই ইকোনমিক জোন, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প আগামীতে চালু হতে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পে অনেক বিদেশি এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা চট্টগ্রামে আসবেন। তাদের পারিবারিক পরিবেশে আবাসন সুবিধা দিতে সিপিডিএল নতুন ধারার এ সেকেন্ড হোম স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট চালু করেছে।
চট্টগ্রামের আবাসন কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্যাটেলাইট সিটির কথা বলে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে লজিস্টিক সাপোর্ট ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে স্যাটেলাইট সিটি গড়ে উঠছে না। কিন্তু তাই বলে কি উন্নয়ন থমকে যাবে? সিপিডিএল আনোয়ারায় গড়ে তুলছে স্যাটেলাইট সিটি ‘অনিন্দ্য নগর’। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলীর তলদেশে টানেলের মাধ্যমে সহজেই আনোয়ারার সঙ্গে যুক্ত হবে চট্টগ্রাম নগর। নদীর ওপারের আনোয়ারায় জমির দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলা গেলে গ্রাহকরা তুলনামূলক কম দামে ফ্ল্যাট পাবেন।’
সর্বোপরি শুধু ফ্ল্যাট তৈরি নয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং একটি নগরীর উন্নয়নেও কাজ করছে সিপিডিএল। একই সঙ্গে নতুন শহর গড়ে তুলতেও এগিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
