কিংবদন্তির পুনর্জন্ম

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:৩১ পিএম

যে ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছেন সালাম-রফিক, অর্ধশতাব্দী পরে সে ভাষাকেই অনন্য আরেক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন ভিন্ন প্রজন্মের আরেক রফিক-সালাম। এ যেন কিংবদন্তির পুনর্জন্ম। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা এনে দেওয়া রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের অভিযাত্রা নিয়ে লিখেছেন আনোয়ার হোসেন

কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ‘সমস্ত পৃথিবীতে প্রচলিত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ভাষার অল্পকিছু ছাড়া অধিকাংশ ভাষাই বিলুপ্তির পথে’ একথা জেনে চমকে ওঠেন। বিলুপ্ত ভাষাগুলোকে পুনরুদ্ধার বা রক্ষা করা যায় কীভাবে এই তাড়না বোধ কাজ করতে থাকে মনে। সেই তাগিদ থেকেই ১৯৯৮ সালের প্রথম দিকে কানাডার ভ্যানকুভার থেকে জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানকে ব্যক্তিগতভাবে একটি চিঠি লেখেন তিনি। এই চিঠিতে তিনি দুটি দাবি জানান। এক. পৃথিবীর এতগুলো ভাষা যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, সে ভাষাগুলো রক্ষা করা যায় কি? দুই. বাংলা ভাষার জন্য বাঙালিরা যে জীবন দিয়েছেন তাদের ত্যাগকে মূল্যায়ন করার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দেওয়া যায় কি? এই চিঠির উত্তর আসে এক মাস পর। জানানো হয় কোনো ব্যক্তি এককভাবে এ রকম একটি প্রস্তাব আনতে পারেন না জাতিসংঘের কাছে। রফিকুল ইসলাম তার ভাবনা ও চিঠির বিষয় নিয়ে আলাপ করেন কানাডায় বসবাসরত আরেক বাংলাদেশি মো. আবদুস সালামের সঙ্গে। এবার রফিক ও সালাম যৌথভাবে চিঠি লেখেন জাতিসংঘের কাছে। চিঠিটি সাবলীলভাবে উপস্থাপনে প্রভূত অবদান রাখেন আবদুস সালাম। দ্বিতীয় চিঠিটি জাতিসংঘে পৌঁছানোর পর উত্তর আসে, আপনাদের দাবিকে উপস্থাপন করার জন্য আপনাদের বিভিন্ন ভাষা-সংক্রান্ত কাজ করে এমন সংগঠনের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। তখন ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে তারা স্থাপন করেন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি বহুভাষী সংগঠন। এই সংগঠন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে একটি আবেদনপত্র প্রেরণ করে। এই আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন সাত জাতির ১০ জন সদস্য। আবেদনপত্র প্রেরণের পর জাতিসংঘ থেকে জানানো হয় এ সম্পর্কীয় কাজ করে ইউনেস্কো। ইউনেস্কো জানায়, শুধু সংগঠন নয়, এটার জন্য বিভিন্ন দেশের সমর্থন দরকার। এই দাবির সমর্থনে হাত বাড়ায় পাঁচটি দেশ। দেশগুলো হলো কানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড ও বাংলাদেশ। তখন রফিক ও সালাম যোগাযোগ করেন বাংলাদেশের তৎকালীন শিক্ষাসচিব মো. রকিবউদ্দিনের সঙ্গে। তারা পুরো বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তাবটি নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এইচ কে সাদেক জাতিসংঘের সদর দপ্তরে তাদের সুপারিশ পেশ করেন। এরপরই আসে সেই শুভক্ষণ। ইউনেস্কো বাঙালির একুশের চেতনাকে উপলব্ধি করে। বাংলা ভাষাকে সম্মান দেখাতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলা ভাষাকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতিদান করে।

আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলামের এই কর্মপ্রচেষ্টায় স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে ২০০১ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’-এ ভূষিত করে। তারা ছিলেন না ’৫২-র সেই মিছিলে কিন্তু ভাষার জন্য অপরিমেয় ভালোবাসা ও উদ্যমের মাধ্যমে স্থান করে নিয়েছেন ইতিহাসে। বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে ভাষাশহীদদের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এই দুজনকেও ভুলবে না বাংলাভাষী মানুষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত