অমর একুশে বইমেলা ও বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তরে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের পরিচয়ে বোমা হামলার হুমকির পর নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই বইমেলার আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলার প্রবেশদ্বারে কঠোর তল্লাশির মুখে পড়তে হয় দর্শনার্থীদের।
তবে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আনসার আল ইসলামের পরিচয়ে পাঠানো চিঠি নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। চিঠি দিয়ে জঙ্গি হামলার নজির বাংলাদেশে নেই। অবশ্য এমন হামলার হুমকির পর বইমেলায় বেচাকেনায় প্রভাব পড়ার শঙ্কায় বিক্রেতারা। একই সঙ্গে গতকাল শুক্রবার ওই হুমকির কোনো প্রভাব মেলায় পড়েনি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বইপ্রেমীদের উপস্থিতিও ছিল স্বাভাবিক।
গত বৃহস্পতিবার সকালে বইমেলা ও পুলিশ সদর দপ্তরে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের পরিচয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদার কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। হাতে লেখা এক পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোডের পাশে দুটি আবাসিক হোটেলে ‘অসামাজিক কার্যকালাপ’ বন্ধের দাবি জানানো হয়। জঙ্গি সংগঠনটি দাবি করেছে, ‘দেহ ব্যবসা’সহ অন্যান্য ‘নারী ঘটিত অপরাধের’ বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। যাত্রাবাড়ীর ওই দুটি আবাসিক হোটেলের বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ ছাড়া বইমেলায় লেখকরাও ‘দেহ ব্যবসা’র বিরুদ্ধে কোনো বই লেখেনি বলে উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।
চিঠিতে আরও লেখা হয়েছে, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের করাচি পুলিশ সদর দপ্তরের মতো বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরে বোমা মেরে পুলিশ হত্যা করব। এটা করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় আছি। পত্র পাওয়ামাত্রই যদি ওই দেহ ব্যবসা বন্ধ করা না হয়, তবে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলায় বোমা মেরে বইপ্রেমীদের খুন করব।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বাংলা একাডেমির নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
হামলার এই হুমকির পর বইমেলার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে সরেজমিনে দেখা গেছে, পুলিশ, র্যাব ও সাদাপোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ব্যাপক তৎপর। নিরাপত্তার স্বার্থে মেলার আশপাশের ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট তুলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি। প্রবেশদ্বারে পুলিশের তল্লাশি ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় আগন্তুকদের শরীর ও ব্যাগ খুলে তল্লাশি করতে দেখা গেছে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের। গেটে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, মেলার শেষের দিকে এমনিতেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এর মধ্যে কথিত জঙ্গি হামলার হুমকির পর বেশি সতর্ক অবস্থানে আছেন তারা।
গতকাল সন্ধ্যায় মেলায় একাধিক বইয়ের স্টলে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেচাবিক্রি অনেক ভালো। কথিত জঙ্গি হামলার হুমকিতে মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। মেলার ‘প্রভাতি প্রকাশ’-এর বিক্রয়কর্মী মো. হৃদয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুক্রবার মেলায় উপস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তাদের বেচাবিক্রিও ভালো হচ্ছে। তবে সামনের দিনগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।
রাজধানীর উত্তরা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে মেলায় আসা এহসানুন জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গি হামলার হুমকির বিষয়টি আমার জানা নেই। মেলায় এসে জানতে পেরেছি।’
রাজধানীর মিরপুর থেকে মেলায় আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘হুমকি-ধমকি দিয়ে বইপ্রেমীদের ঘরে আটকে রাখা যাবে না।’
বইমেলা প্রাঙ্গণটি পড়েছে ডিএমপির রমনা বিভাগের মধ্যে। এ বিষয়ে রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. শহীদুল্লাহ গতকাল দুপুরে তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জঙ্গি হামলার চিঠিটি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছুটির দিনে (গতকাল শুক্রবার) বইমেলার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ধরনের চিঠি আগেও আমরা পেয়েছি। এই চিঠির ওপর ভিত্তি করে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
পুলিশ সদর দপ্তরে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মিডিয়া অ্যান্ড পিআর মো. মনজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু জঙ্গি হামলার হুমকির জন্য নয়, পুলিশ সদর দপ্তরে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা সব সময়ই আছে। বইমেলার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।’
জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোমা হামলার হুমকি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উড়োচিঠি দেওয়া হয়েছে। তবুও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করছি।’
আগে থেকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর বোমা হামলার নজির নেই উল্লেখ করে সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘ডাকযোগে চিঠি পাঠানো হলেও কোথা থেকে এবং কীভাবে পাঠানো হয়েছে সবগুলো বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।’
২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় গেলে সন্ত্রাসী হামলায় খুন হন সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক অভিজিৎ রায় (৩৭)। এর আগে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বহুমাত্রিক লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়। তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর একই বছরের ১২ আগস্ট জার্মানিতে মারা যান হুমায়ুন আজাদ।
