রাগবি আর রক সংগীতে ইংল্যান্ডের অনুশীলন

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:১৬ পিএম

বাসের হর্ন, জটলার আওয়াজ...সবকিছুকে ছাপিয়ে কানে আসছিল রেড হট চিলি পিপার্সের ‘ক্যালফোর্নিকেশন’ গানের চেনা সুর। মিরপুরে শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অ্যাকাডেমি মাঠে চলছে ইংল্যান্ড দলের প্রথম দিনের অনুশীলন, সুরের উৎস সেখানেই স্যাম কারেনের ব্লু টুথ স্পিকার। প্রথম ইংরেজ বোলার হিসেবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব কারেনের, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়কে আইপিএলের নিলামে পাঞ্জাব কিংস কিনেছে সাড়ে ১৮ কোটি রুপিতে। এমন কেউ অনুশীলনে যদি গান বাজিয়ে বোলিং করেন, তাতে দোষের কী আছে!

অবশ্য ক্রিকেটের সঙ্গে সুরের মূর্ছনার যোগসূত্র নতুন নয়। ভারতীয় দলের ড্রেসিং রুমে আর টিম বাসে নাকি পাঞ্জাবি গানই বেশি বাজে, এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন বিরাট কোহলি। ক্যারিবিয়ানরা তো গানের ছন্দে শরীর দুলিয়েই হাঁটেন। বাংলাদেশ দলের অবশ্য ‘আমরা করব জয়’ আর ‘অপরাধী’ ছাড়া অন্য কোনো গানের প্রতি আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি, বরং আড়ি পেতে শোনা খবর অনেক ক্রিকেটারই নাকি ইসলামি বক্তাদের নিয়মিত শ্রোতা। টেস্ট ক্রিকেটের বিশুদ্ধতার বেলায় ইংল্যান্ড যতটা গোঁড়া, সাদা বলের খেলার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ততটাই উদার। বিশেষ করে ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায়ের পর উপভোগের মন্ত্রে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলাটাই তাদের দর্শন। যে দর্শন তাদের জিতিয়েছে ৩ বছরের ভেতর দুটো বৈশ্বিক শিরোপা, ২০১৯ এর ওয়ানডে বিশ্বকাপ আর ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। দেশপ্রেম জাগাতে পাকিস্তানের কোচ সাকলায়েন মুশতাক এই মিরপুরে অ্যাকাডেমি মাঠে বিশাল এক পাকিস্তানি পতাকা টাঙিয়েছিলেন, যা জন্ম দিয়েছিল বিতর্কের। অনুশীলনকে উপভোগ্য করতে স্যাম কারেনের রক মিউজিক করছে ঠিক সেই কাজটাই, ফাগুন হাওয়ায় গানের সুরে মেতে উঠে অনুশীলনটাকে উপভোগ্য করার সুযোগ করে দিচ্ছে বহুজাতিক ইংল্যান্ড দলকে।

ক্রিকেটের মতো রাগবিও ইংরেজদেরই আবিষ্কার। ইংল্যান্ডে রাগবির জনপ্রিয়তা ক্রিকেটের চেয়েও বেশি, অভিজাত স্কুলগুলোর রাগবি প্রতিযোগিতার ইতিহাস একশ বছরেরও পুরনো। ইংল্যান্ড দলের ক্রিকেটারদের গা গরমের শুরুটা তাই বোধহয় হয়েছে রাগবি দিয়েই। শেরে-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মূল মাঠে সকালে কিছুটা সময় রাগবি খেলেই আড়মোড়া ভেঙেছেন বাটলার-মঈন আলিরা। এরপর অ্যাকাডেমি মাঠে নেট সেশনের জন্য যাওয়া। পেসারদের গায়ে ততক্ষণে উঠে গেছে স্মার্টভেস্ট। ফুটবলে শীর্ষ পর্যায়ের দলগুলো ব্যবহার করে এই প্রযুক্তি, খাটো গেঞ্জি আকৃতির একটি পোশাকে লাগানো সেন্সর খেলোয়াড়দের শরীর থেকে পাঠায় অনেক তথ্য। পোশাকে আছে জিপিএস, ম্যাগনেটোমিটার আর অ্যাকসেলেরো মিটার, যা সেকেন্ডে ১২৫০ রকম তথ্য পাঠায়। এতে করে জানা যায় একজন খেলোয়াড় কতটুকু দৌড়ালেন, কত ক্যালরি খরচ হলো, সর্বোচ্চ গতি কত, হৃৎস্পন্দন কত, এমন অনেক তথ্য যা কোচদের কাজে লাগে। জোফ্রা আর্চার, মার্ক উডরা সেই স্মার্টভেস্ট গায়ে চাপিয়েই বল করেছেন অনুশীলনে। ব্রায়ান অ্যাডামসের সামার অফ ৬৯, ঈগলসের হোটেল ক্যালফোর্নিয়াসহ ৮০’র দশকের অনেক জনপ্রিয় রক ব্যান্ডের গান শুনেই অনুশীলন নেটে বল করলেন ইংল্যান্ডের পেসাররা।

ব্যাটসম্যানরাও নিজেদের ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন নেটে। অবশ্য ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের বেশিরভাগেরই মিরপুরের মাঠের অলিগলি চেনা। ডাভিড মালান, জেসন রয় থেকে জস বাটলার কিংবা মঈন আলি; বিপিএল খেলতে তো অনেকবারই তারা এসেছেন ঢাকায়। তবে অবাক করা ব্যাপার, এবার ইংল্যান্ডের নেটে বেশ কয়েকজন বামহাতি স্পিনার দিয়েছে বিসিবি! একটা সময় বাংলাদেশের বোলিং মানেই ছিল বামহাতি স্পিনার, বিসিবিও তাই সফরকারী দলকে নেট বোলার হিসেবে বামহাতি স্পিনারদের দিত না। এখন সময় বদলেছে। নিয়মিত একাদশে বামহাতি স্পিনারের সংখ্যা কমে হয়েছে এক, সেটাও সাকিব আল হাসান। তাই নেটেও বেড়েছে বামহাতি স্পিনারের সংখ্যা।

স্যাম কারেনের গানের বাক্স থেকে অনেক সুরই বেরিয়েছে। উপভোগ্য সব সংগীতের সঙ্গে অনুশীলন উইকেটে বেজেছে ‘চিন মিউজিক’ও। ক্রিকেটের পরিভাষায় যাকে বলে ব্যাটসম্যানের কণ্ঠা বা চোয়াল সমান উচ্চতার বাউন্সার দেওয়া। আর্চার-উডরা সমানতালেই বাউন্স আদায় করছিলেন অ্যাকাডেমি মাঠের উইকেট থেকে। দলে কোচ হিসেবে চন্দিকা হাথুরাসিংহের পুনরাগমন এবং তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে যে গেরিলা যুদ্ধের সূত্র, তাতে এটা নিশ্চিত যে মূল খেলায় উইকেটে অমন বাউন্স রাখাই হবে না। সেটাই ভরসার জায়গা কারণ রক মিউজিক যতটা উপভোগ্য, ‘চিন মিউজিক’ যে ততটাই ভয়ংকর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত