নজরুলসংগীত নিয়ে তৃপ্ত ফোক নিয়ে নয়

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৩০ এএম

আমি নজরুলসংগীতে আলাদা পরিচিতি পেলেও নানা ধরনের গানই করি। বিশেষ করে আমার দাদার (ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাস উদ্দিন) উত্তরাধিকার হিসেবে ভাওয়াইয়া আমি নিয়মিত করি। এছাড়া নজরুলের সাহিত্য-গীতের পাশাপাশি ফোক গান নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলা ফোক গানের ইতিহাস তো বহু প্রাচীন। সেসব আপনারা নানা বইপুস্তকে পেয়েও যাবেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বোধগম্যতার জায়গা থেকে যদি বলতে হয়, প্রথমেই দাদার প্রসঙ্গ আসবে। তাকে ভাওয়াইয়া সম্রাট বলে অভিহিত করা হয়। তবে ফোক গানের নানা অঙ্গে ছিল তার পদচারণা। তিনি গান গাওয়ার পাশাপাশি শেখানো ও গান সংগ্রহের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। তখন থেকেই আমাদের বাড়িতে বিরাট বিরাট ফোক গানের শিল্পীরা আসতেন। আমি তো দাদাকে সেভাবে পাইনি। তবে চাচা মোস্তফা জামান আব্বাসীকে দেখেছি শৈশব থেকেই। ফোক নিয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। নিজে খুব ভালো ফোক গান গাইতেনও। পাশাপাশি ফোক গানের প্রচার ও প্রসারে টেলিভিশন অনুষ্ঠান করা, ডকুমেন্টারি অনুষ্ঠান করা থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করেছেন। বিটিভিতে ‘বহরা নদীর বাঁকে’ তার উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে এক এক পর্বে এক একটি ফোক অঙ্গের গানকে থিম করা হতো। দেশের সব বিখ্যাত শিল্পীরা তাতে অংশ নিতেন। ভাওয়াইয়া তো আছেই, ভাটিয়ালি, আঞ্চলিক গীত, জারি, সারি, গম্ভীরা, লালন, হাছন, রাধারমন, শাহ আব্দুল করিম, পঞ্চকবি সব ধরনের গান নিয়েই তিনি কাজ করতেন। তখন আমাদের ফোক গানের বৈচিত্র্য দেখে গর্বে বুকটা ভরে উঠত। দর্শক-শ্রোতারাও দারুণ উপভোগ করতেন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই গানগুলো। কিন্তু এখন ফোক গান নিয়ে আমার কিছুটা হতাশা আছে বৈকি। আমি তো প্রায়ই বিভিন্ন গানের শোয়ের বিচারক হিসেবে যাই। দেখি, জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অল্পসংখ্যক ফোকগানই সবাই করছে। শুধু তাই নয়, এখন যারাই ফোক গান করে সবাই হয় লালনের গান করছে, নয়তো রাধারমন বা শাহ আব্দুল করিম। বড়জোর বিচ্ছেদি বা আধ্যাত্মিক পর্যায়ের কিছু গান শোনা যায়। ভাওয়াইয়া তো একেবারেই কেউ করছে না। আব্দুল আলিমের ভাটিয়ালির সেই দরাজ গলা আর কই? জারি সারি তো এখন খোদ গ্রামেই হয় না। পালাগান, যাত্রাপালা তারও তো কোনো খবর পাই না। আগে যারা ফোক গান চর্চা করতেন তারা হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেই করতেন। এজন্যই তাদের কণ্ঠে সেই আকুতি, সেই তীব্র আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেত। মাটির সোঁদা গন্ধ পাওয়া যেত। এখনকার ফোক গানে সেগুলো অনুপস্থিত। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আমাদের হাজার বছরের ফোক গানের গৌরব হারিয়ে ফেলব। নজরুল ইনস্টিটিউট যেভাবে পরিকল্পিতভাবে নজরুলসংগীতগুলো শুদ্ধ সুর ও বাণীতে গাওয়ার ব্যাপারে কাজ করেছে, গানগুলো সংরক্ষণ করেছে ঠিক সেভাবে যদি আব্বাসউদ্দিন একাডেমি বা কোনো সংগঠন গড়ে তোলা যেত তাহলে ফোক গান নিয়েও আমরা আশাবাদী হতে পারতাম। এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। যোগ্য লোকেরা জীবিত থাকতে যদি তাদের দিয়ে কাজ করানো যায় তাহলে আমাদের এই শক্তিশালী ফোক গানগুলো বারবার বাংলাদেশের নাম বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরবে বলে আমি দৃঢ় বিশ্বাসী।

image

সেদিক থেকে আমি নজরুল সংগীত নিয়ে তৃপ্ত। স্বাধীনতার আগে থেকেই নজরুলসংগীত চর্চা ছিল। তবে সেটা পশ্চিমবঙ্গেই বেশি হতো। আর স্বাধীনতার পরে আমরা নিজেদের মতো করে এই চর্চাটাকে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি। শিল্পী সুধীন দাশ এবং কবি তালিম হোসেন স্বাধীনতার আগেই নজরুল একাডেমি গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পরে একাডেমির কাজের পরিসর বেড়ে যায়। সেখান থেকে উনারা নজরুলের অনেক গানের শুদ্ধ সুর ও বাণী খুঁজে বের করেছিলেন। সেগুলো অনুসরণ করেই শিল্পীরা তখন গান গাওয়া শুরু করেন। সেটা একটা প্রজন্ম ছিল। আরও দশ-পনের বছর যেতে যেতে সেই সুরগুলো আমরা আরও ভালোভাবে পেলাম। কারণ তখন ভারতেও একটা আন্দোলন শুরু হয়। নজরুল নিজে যে গানগুলোর সুর দিয়েছেন, সেই সঠিক সুরগুলো খুঁজে বের করার আন্দোলন। এরপর ১৯৮৮ সালে জাতীয় কবির ধানম-ির বাসভবনকেই নজরুল ইনস্টিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানেও খুব অ্যাকটিভলি নজরুলের গানের শুদ্ধ সুর প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে কাজ করা হয়। আমিও সেই সময়ে গান গাওয়া শুরু করি। তখন আমিসহ অনেকেই নজরুল ইনস্টিটিউটে নিয়মিত যেতাম। ওরা একটা করে রেকর্ড আমাদের দুই ঘণ্টার জন্য ধার দিত। তবে সেটা বাড়ি নিয়ে আসার কোনো উপায় ছিল না। বা এমন কোনো ডিভাইজ ছিল না যে আমরা রেকর্ড করে আনব। তাই সেখানে বসেই রেকর্ডগুলো বাজিয়ে বাজিয়ে গান তুললাম। একদিনে গানটি তুলতে না পারলে পরের দিন আবার গিয়ে তুলতে হতো। এভাবেই সুধীন দাশ, সোহরাব হোসেনরা অনেক গান তুলে ফেলেন। এরপর সেখানে অনেকগুলো কোর্স আরম্ভ হলো। ব্যাচের পর ব্যাচ ছাত্র-ছাত্রী আসত নজরুলসংগীত শিখতে। তারাই চারদিকে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ল। এতদিনে আমরা নজরুলের চার হাজার গানের শুদ্ধ স্বরলিপি পেয়েছি, যা নানা প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। এখন সেই চর্চা আরও বিস্তৃত হয়েছে। আমরা অনেকগুলো সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের আনাচে-কানাচে গিয়ে গান শেখাতে পেরেছি। আরও শিখিয়েছি কীভাবে ইউটিউব থেকে গান ডাউনলোড করতে হয়, কোথা থেকে সঠিক স্বরলিপিগুলো জোগাড় করতে হয়। এরফলে এখন যখন কোনো প্রতিযোগিতা বা অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের গান শুনি, তখন দেখি প্রত্যেকেই শুদ্ধ সুরটাকে চর্চা করছে। কিছুদিন আগে গুলশান পার্কে নজরুলসংগীত সংস্থা দুদিনব্যাপী নজরুলসংগীত সম্মেলন করেছে। সেখানে দেখলাম তরুণ প্রজন্ম কী চমৎকার গান করছে। সঠিকভাবে গানগুলো সংরক্ষণ হচ্ছে। তাই তো পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেও অনেকে আমাদের স্বরলিপি নিয়ে যায়। আমাদের কাছে নজরুলের গান শেখে। এটা আমাদের সংগঠন ও কিংবদন্তি নজরুল সংগীতশিল্পী সুধীন দাশ, সোহরাব হোসেন, ফেরদৌসী রহমান, ফিরোজা বেগমের অবদানে হয়েছে। এর পরে শবনম মুশতারি, খালিদ হোসেন, ফাতেমা তুজ জোহরা, শাহিন সামাদ, ইয়াসমিন মুশতারি, খায়রুল আনাম শাকিল, রওশন আরা মুস্তাফিজরা তাদের গায়কি দিয়ে অনেক শ্রোতা ও তরুণ শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছেন। নিজের কথা আর কী বলব? আমি নজরুলসংগীত চর্চার মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকিনি। নজরুলের প্রচার ও প্রসারের জন্য আমি তার ৭টি বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি। তারমধ্যে গানের বই যেমন রয়েছে, তেমনি কবিতা আছে, গল্প আছে, সম্পাদকীয় আছে, উনার জীবনী আছে। এমনভাবে অনুবাদ করেছি যাতে কেউ বাংলা না জানলেও যেন নজরুলের সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারেন।  

অনুলিখন :  মাসিদ রণ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত