রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার এক ছাত্রীকে আবাসিক হলে তুলে দিতে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা এম তারেক নূর। গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল গেটের ছিটকিনি লাগিয়ে সামনে অবস্থান নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা। প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরিয়াল বডি তাকে উদ্ধার করেন।
এদিকে ছাত্র উপদেষ্টাকে অবরুদ্ধ করার খবর পেয়ে বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রধান ফটকসংলগ্ন রাস্তার এক পাশে অবস্থান নিতে শুরু করেন সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ সমাজকর্ম বিভাগের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত হন। পৌনে ৫টার দিকে হল গেটে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেন প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। পরে তারা ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক তারেক নূরকে বের করে নিয়ে আসতে চাইলে গেটের ভেতরের দিক থেকে সামনে অবস্থান নেন সংগীত বিভাগের ছাত্রীরা। এ সময় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হল থেকে তারেক নূরকে বের করে আনতে চাইলে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা চিৎকার শুরু করেন। একপর্যায়ে সমাজকর্ম ও সংগীত বিভাগ এবং ছাত্রলীগকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। এ সময় হল গেটের সামনে দুই-উপাচার্য, জনসংযোগ প্রশাসক, প্রক্টর উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সংগীত বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ঘটনাস্থলে সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাংবাদিকরা আন্দোলনের ফুটেজ ধারণ করতে গেলে সংগীত বিভাগের কয়েকজন ছাত্রী অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ ছাড়া তারা অভিযোগ করেন, সাংবাদিকরা সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী বিরুদ্ধে নিউজ করেছেন।
রাত সাড়ে ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনে সংগীত ও সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠক শেষ হয়। এরপর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম জানান, আজ বৃহস্পতিবার আবার বসে সিদ্ধান্ত হবে। তার এ ঘোষণার পর সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থীরা হলের সামনে থেকে অবস্থান প্রত্যাহার করেন।
হল সূত্রে জানা যায়, হল প্রাধ্যক্ষের উপস্থিতিতে মানসিক নির্যাতনের শিকার সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী সুমাইয়া দুপুর ১টার দিকে হাসপাতাল থেকে ছাত্র উপদেষ্টার দপ্তরে আসেন। এর আগে রাতের সিদ্ধান্ত হয় অভিযুক্ত সংগীত বিভাগের ছাত্রী দোলনের সিট অন্যত্র স্থানান্তর করার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে নিয়ে দেড়টার দিকে হলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা তারেক নূর। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সংগীত বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক শায়লা তাসমিন। সেখানে তার সঙ্গে ছাত্র উপদেষ্টার বাগ্বিত-া হয়। একপর্যায়ে সেখান থেকে চলে যান শায়লা তাসমিন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা হল গেটে উপস্থিত হন। তাদের শিক্ষককে অপমান করা হয়েছে উল্লেখ করে তারা হল গেট অবরুদ্ধ করে আন্দোলন করতে থাকেন। এতে হলের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন ছাত্র উপদেষ্টা। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয়। এদিকে সংবাদ সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত চারজন সাংবাদিকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন শিক্ষার্থীরা।
সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে দোষীসাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এ ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে এলে তাদের বিভাগের সভাপতিকে ছাত্র উপদেষ্টা লাঞ্ছিত করেছেন বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংগীত বিভাগের সভাপতি শায়লা তাসমিন বলেন, ‘আমার বিভাগের এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে অন্য বিভাগের এক ছাত্রীকে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি জানতে আমি ছাত্র উপদেষ্টাকে ফোন দিই। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে জানতে পারি তিনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলে আছেন। তখন এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি হলে যাই। সেখানে তিনি আমার শিক্ষার্থীদের সামনে আমাকে অপমানজনক কথা বলেন। একপর্যায়ে বলেন “হু আর ইউ”, আপনি কেন এখানে আসছেন। এতে আমি অপমানিত বোধ করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করি।’
মূল ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে হলের একাধিক আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, গত ২০ ফেব্রুয়ারি পানি গরমের হাঁড়ি নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সঙ্গে দোলনের কথাকাটাকাটি হয়। এতে দোলন ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ‘বেয়াদবি’র অজুহাতে তার সিট বাতিল করে গণরুমে দেওয়ার জন্য হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর একটি আবেদনপত্র জমা দেন। তিনি ছাত্রলীগ নেত্রীর ভয় দেখিয়ে ব্লকের ছাত্রীদের কাছে স্বাক্ষর গ্রহণ করেন। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হল প্রাধ্যক্ষ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে গণরুমে স্থানান্তর করেন।
তবে হল প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ব্লকের শিক্ষার্থীরা হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর একটি আবেদন দিতে গেলে হলের আবাসিক শিক্ষকরা বলেন, ‘সিদ্ধান্ত যা হয়েছে তাই বহাল থাকবে।’ যদিও পরে তারা আবেদনটি গ্রহণ করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে হল প্রাধ্যক্ষের উপস্থিতিতে সুমাইয়া নামে এক শিক্ষার্থীকে মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী দোলন, হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক স্মৃতি বালার বিরুদ্ধে। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় দুই ভুক্তভোগীকে ভিন্ন দুই ব্লকে পাঠানোর। এ ছাড়া ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে।
