সেই মালানের ব্যাটেই হারিয়ে গেল জয়ের স্বপ্ন

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৩, ০৬:২৩ এএম

২০১৩ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে দল প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে খেলতে এসেছিলেন ডাভিড মালান। সেবারই প্রথম বাংলাদেশে আসা। ইংল্যান্ডে জন্মালেও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকায়। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসানরা যখন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে, তখন মালান খেলছেন ইংল্যান্ডের কাউন্টিতে। এক দশক পর সেই মালানই দেখালেন, শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেটে কীভাবে ব্যাটিংটা করতে হয়। ২১০ রান তাড়ার ম্যাচে ওয়ান ডাউনে নেমে মালানের দায়িত্বশীল শতরানে ভর করেই তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে ৩ উইকেটে হারিয়েছে ইংল্যান্ড।

চান্দিকা হাথুরুসিংহের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম ম্যাচ, বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও প্রথম। প্রত্যাশার চাপ, স্নায়ুর চাপ সবই ছিল। সেজন্যই কি ব্যাটিংয়ের আড়ষ্ট ভাবটা গেল না? তামিম ইকবাল মাস-ছয়েক পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলেন। বিপিএলে ১০ ম্যাচে ৩০০ রান করার পরিতৃপ্তি নিয়ে যে ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি হয় না, সেটা টের পেয়েছেন ওয়ানডে অধিনায়ক। ৩২ বলে ২৩ রানের ইনিংস, ৪টা বাউন্ডারি, কিন্তু কখনোই খুব স্বচ্ছন্দ মনে হয়নি তাকে, মার্ক উডের বলে দৃষ্টিকটুভাবে বোল্ড হয়েই তার প্রত্যাবর্তনের ইনিংসের ইতি। লিটন দাস ক্রিস ওকসকে দর্শনীয় শটে ছক্কা মারার পরের বলেই আউট, লেগ বিফোর উইকেটের সিদ্ধান্ত থেকে বাঁচতে পারেননি রিভিউ নিয়েও।

ভারতের বিপক্ষে সিরিজে সাকিব আল হাসান ব্যাট করতে এসেছেন চারে কিংবা তিনে, কাল চারে আসতে দেখা গেল মুশফিকুর রহিমকে। বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটার হিসেবে যার পরিচিতি, অনুশীলনে সবচেয়ে অধ্যবসায়ী হিসেবেই যার সুনাম। তবে বেশ কিছুদিন ধরেই মুশফিকের অনুশীলনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না স্কোরকার্ডে। গেল বছরের আগস্টে সবশেষ হাফসেঞ্চুরি ওয়ানডেতে, সবশেষ ৫ ইনিংসে সর্বোচ্চ রান ১৮। অভিজ্ঞ মুশফিকের সামনে কাল সুযোগ ছিল ইনিংসটা বড় করার, যে দায়িত্বটা পালন করেছেন মালান।

৩৩টা বল খেলা হয়ে গিয়েছিল মুশফিকের, ১টা ছয়ও মেরেছিলেন মইন আলির বলে। নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে ৬২ বলে ৪৪ রানের একটা জুটিও জমে গিয়েছিল। সেখান থেকে কেন যে সেই সর্বনাশা সøগ সুইপ খেলতে গেলেন! লেগস্পিনার আদিল রশিদের বিপক্ষে ঠিক জুত করে উঠতে পারছিলেন না, হতাশা থেকেই বোধ হয় স্লগ সুইপ। লেগস্পিনারের পাতা ফাঁদে ধরা পড়লেন মার্ক উডের হাতে, ৩৪ বলে ১৬ রানেই সমাপ্তি ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’-এর।

বিপিএলে ৫০০র বেশি রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। রানের ধারাটা ধরে রেখে কাল ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতকের দেখাও পেয়েছেন এই বামহাতি, খেলেছেন ৮২ বলে ৫৮ রানের ইনিংস। যদিও ইনিংসটা আরও বড় করার সুযোগ ছিল শান্তর সামনে, যেটা করে দেখিয়েছেন মালান। শান্ত বললেন, ‘আমাদের সামনেও সুযোগ ছিল, অতীতে আমাদের অনেকেই এরকম ইনিংস খেলেছেন ম্যাচ জিতিয়েছেন।’ সেই অতীত আর বর্তমানে রূপ নেয়নি। সাকিবের ৮, মাহমুদউল্লাহর ৩১, আফিফ হোসেনের ৯ আর মেহেদী হাসান মিরাজের ৭। এই চার ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে আসল মাত্র ৫৫ রান। এখানেই বড় হলো না বাংলাদেশের ইনিংসটা। দিনশেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা মালানও যেটা মানলেন, ‘আমরা আসলে খানিকটা অবাকই হয়েছি এত অল্প রান তাড়া করতে হবে দেখে। আমরা ভেবেছিলাম অন্তত আরও ত্রিশ-চল্লিশটা রান বেশি করতে হবে আমাদের।’

যে ইংল্যান্ড দল হরহামেশাই সাড়ে তিনশ-চারশ রান করে, তাদের সামনে ২১০ রানের পুঁজি তো খড়কুটোর মতোই উড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এই অল্প পুঁজিতেই দারুণ লড়াই করল বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই সাকিব নিয়েছেন জেসন রয়ের উইকেট, তাইজুল ইসলাম বোল্ড করেন ফিল সল্টকে আর তার বলে স্টাম্পড হন জেমস ভিনস। ৬৫ রানে নেই ইংল্যান্ডের ৪ উইকেট, বিদায়ীদের ভেতর অধিনায়ক জস বাটলারও আছেন তাসকিন আহমেদের একমাত্র শিকার হয়ে। এমন বিরুদ্ধস্রোতে একাকী লড়লেন এবং দলকে জেতালেন মালান। উইল জ্যাকসের সঙ্গে ছোট একটা জুটি হলো মালানের, ৩৮ রানের সেই জুটিটায় কিছুটা স্থিতিশীল ইংল্যান্ড। মিরাজের বলে জ্যাকসের বিদায়ের পর মালান জুটি গড়েন মইন আলির সঙ্গে। সেটাও ৩৮ রানের।

এই দুই জুটিতেই ধীরে ধীরে জয়ের কাছে যেতে থাকে ইংল্যান্ড। তবুও সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। ক্রিস ওকস আউট হওয়ার পর শেষ ৩ উইকেটে ইংল্যান্ডের জিততে লাগত ৫০ রান। দায়িত্ব নিয়ে সেই পথটা পাড়ি দিলেন মালানই, ১৬তম ওয়ানডেতে পেয়ে গেলেন চতুর্থ শতরানের দেখাও। অষ্টম উইকেটে আদিল রশিদকে নিয়ে মালানের ৫১ রানের জুটি, তাতে মালানের অবদানই ৩৪ রান।

ম্যাচশেষে এই ইংলিশ ক্রিকেটার জানালেন, বাংলাদেশে খেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা অনেক কাজে দিয়েছে, ‘খুব সম্ভবত ওয়াইজ শাহ আমাকে প্রথম বাংলাদেশে খেলতে আসার কথা জানিয়েছিল, এরপর শুনেছিলাম রবি বোপারার কাছে। প্রাইম দোলেশ্বরে দুটো দারুণ মৌসুম কাটিয়েছি। এরপর বিপিএলে খেলেছি কয়েক মৌসুম। এখানে খেলে আমি স্পিন বোলিং খেলতে শিখেছি, যেটা ইংল্যান্ডে পারতাম না, কারণ এখানকার কন্ডিশন ইংল্যান্ড থেকে একদমই আলাদা। এটা আমার খেলাকে অনেক এগিয়ে নিয়েছে।’

মালান জানতেন, খারাপ সময়টা পার করে ফেললে ইনিংসের শেষের দিকে রান করাটা আস্তে আস্তে সহজ হয়ে যাবে। জানতেন শেষ দিকে শিশির পড়বে। অভিজ্ঞতালব্ধ সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দলের জয়টা নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়লেন মালান। আক্ষেপটা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সংবাদ সম্মেলনে প্রায়ই বলেন যে, মিরপুরের ঘাস তাদের হাতের তালুর মতো চেনা। অথচ এই চেনা মানচিত্রেই যে তারা পথ হারালেন, তাই সংগ্রহটা বড় হলো না। দিনশেষে কিছু রান না করার আক্ষেপই সঙ্গী, অথচ ফাল্গুনের দিনটার শেষ হতে পারত দেশের মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেওয়ার তৃপ্তি নিয়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত