প্রচ্ছদ ও গ্রন্থচিত্রণ

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ১২:৩৮ এএম

প্রচ্ছদ এমন একটি ব্যবহারিক শিল্পকলা যেটি তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট বইয়ের লেখা বিষয়বস্তু বা গল্প উপন্যাস কবিতা ছড়া প্রবন্ধ ইত্যাদিকে আশ্রয় করে। তাই প্রচ্ছদকে বলা যায় পরাশ্রয়ী শিল্প। মানে আগে লেখাটার জন্ম হয় তারপর সেই লেখাটাকে আশ্রয় করে প্রচ্ছদ তৈরি হয়। এখানে কনটেন্ট বা বিষয়বস্তুই মূল। প্রচ্ছদ শিল্পীর এর বাইরে গিয়ে প্রচ্ছদ বানানোর তেমন কোনো সুযোগ নেই। লেখকের ভাবনাকে প্রচ্ছদ সাইজ কাগজের মধ্যে যতদূর সম্ভব ফুটিয়ে তোলার জন্য কোন মাধ্যমে, কোন বিন্যাসে, কোন রঙে কোন ঢঙে বানাতে হবে ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখেই একটা প্রচ্ছদের জন্ম হয়। এখন এই রঙঢঙ বা করণকৌশলের বিষয়টা মাথায় রেখে বলা যায় প্রচ্ছদ চার ধরনের হতে পারে।

এক. ইলাস্ট্রেটিভ প্রচ্ছদ।

বইয়ের বিষয়বস্তুর ভাব-কল্পনা বা বর্ণনা ইলাস্ট্রেশন বা আঁকা ছবির মাধ্যমে বানানো প্রচ্ছদ।

দুই. টাইপোগ্রাফিক প্রচ্ছদ।

টাইপোগ্রাফি, ফন্ট বা হরফ প্রধান বিষয়বস্তু করে আঁকা প্রচ্ছদ।

তিন. ফটোগ্রাফিক প্রচ্ছদ

ক্যামেরায় তোলা ফটো বা আলোকচিত্র ব্যবহার করে বানানো প্রচ্ছদ।

চার. মিশ্র প্রচ্ছদ

আঁকা ছবি, ফটোগ্রাফি, টাইপোগ্রাফি, ইত্যাদি নানামুখী অবজেক্টেও মিশেলে তৈরি প্রচ্ছদ।

বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদের প্রাথমিক যুগের প্রচ্ছদশিল্পীরা হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, শ্রী আশু, ফণীভূষণ গুপ্ত, পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, সমর দে, অন্নদা মুনসী, কাজী আবুল কাশেম প্রমুখ শিল্পীর। এরপর সত্যজিৎ রায়, মাখন দত্ত গুপ্ত, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, খালেদ চৌধুরীরা কাজ করেন। সময়ের নিয়মে পূর্বজদের হাত ধরে প্রচ্ছদ শিল্পে আসেন রণেন আয়ানদেশে দত্ত, অজিত গুপ্ত, সমীর সরকার, পূর্ণেন্দু পত্রী প্রমুখ শিল্পীরা।

image

বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ যাত্রায় একটি বিশেষ ধারাও রয়েছে। ১৯৪৮-এ  শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশে চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এর পর থেকে আমাদের প্রচ্ছদশিল্পের নিজেদের একটা জগৎ তৈরি হয়। এদেশে প্রচ্ছদেও প্রাথমিক যুগে শিল্পীর সংখ্যা ছিলেন হাতেগোনা। কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্র জয়নুল আবেদিন এবং কাজী আবুল কাশেম বাংলাদেশের প্রচ্ছদশিল্পের পথপ্রদর্শক। কামরুল হাসান, খালেদ চৌধুরী, ইমদাদ হোসেন, আব্দুর রউফ, মোস্তফা মনোয়ার, কাইয়ুম চৌধুরী। আরও পরে যুক্ত হন আমিনুল ইসলাম, আশীষ চৌধুরী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, হাশেম খান, প্রাণেশ মন্ডল, কামাল মাহমুদ, সিরাজুল হক, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, মুকতাদির, গোপেশ মালাকার, হারাধন বর্মণ, নিতুন কুন্ডু প্রমুখ শিল্পী। ষাট দশকের শেষ ও সত্তরের দশকে আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য শিল্পী প্রচ্ছদশিল্পের যাত্রায় যুক্ত হন। সাবিহ-উল-আলম, রফিকুন্নবী, আবুল বারাক আলভী, মোহাম্মদ মোহসিন, গোলাম সারওয়ার, আসেম আনসারী, আব্দুর রউফ সরকার, কাজী হাসান হাবিব, বীরেন সোম, সৈয়দ লুৎফুল হক। সত্তরের মাঝামাঝি থেকে আশির দশক সময়ের মধ্যে প্রচ্ছদ নিয়ে আরও অনেক শিল্পী কাজ শুরু করেছেন। এদের মধ্যে ফরিদা জামান, শওকাতুজ্জামান, সৈয়দ ইকবাল, মাহবুব আকন্দ, আফজাল হোসেন, খালিদ আহসান, আইনুল হক, মামুন কায়সার, মাসুক হেলাল, শিশির ভট্টাচার্য, সমর মজুমদার অন্যতম। পরবর্তী সময়ে আনওয়ার ফারুক, অশোক কর্মকার, রফি হক, ধ্রুব এষ। বাংলাদেশের প্রচ্ছদে বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি ঘটিয়েছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। প্রচ্ছদের বহুমাত্রিক মাধ্যমকে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি এ শিল্পকে নিয়ে গেছেন এক ভিন্নমাত্রায়। তারপরের সময়ে গুপু ত্রিবেদী, নাজিব তারেক, সব্যসাচী হাজরা, সব্যসাচী মিস্ত্রী, মোস্তাফিজ কারিগর, নিয়াজ চৌধুরী তুলি, কাব্য করিম, তৌহিন হাসান, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, রাজীব দত্ত , শিবু কুমার শীল,  চারু পিন্টু, সাদাত, বিপ্লব, তীর্থ, মেহেদী হক, নাসরিন সুলতানা মিতু, রোমেল, গৌতম ঘোষ, আমজাদ আকাশ, মিতা মেহেদী, আবু হাসানসহ  আরও অনেক প্রতিভাবান শিল্পী প্রচ্ছদশিল্পে অবদান রেখেছেন, রাখছেন। উল্লিখিত প্রায় সব শিল্পীই বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ নিয়েও কাজ করেছেন।

১৮০১ সালে পঞ্চানন কর্মকারের সচল হরফ আবিষ্কারের ফলে প্রকাশন শিল্পে এসেছিল এক নতুন যুগ। কিন্তু সেই সব বইয়ের পাতার পর পাতায় শুধু সাজানো অক্ষর- চোখকে যেন এক ক্লান্তির মধ্যে নিয়ে চলে। এই পরিস্থিতিতেই নিহিত ছিল অলংকরণ শিল্পের জন্মসূত্র। ভাবতে হলো শুধু ভালো ছাপা হলেই হবে না তাকে হতে হবে দৃষ্টিনন্দন। এই প্রয়োজনেই এলো গ্রন্থসজ্জা। বইয়ের আকার-প্রকার-পৃষ্ঠাসজ্জা-নামপত্র থেকে বিভিন্ন রচনা অনুসারী বিভিন্ন ও বিচিত্রধর্মী চিত্রণ- যাকে আজ  আমরা অলংকরণ বলি।

শিশুদের বইয়ের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদের মতোই ভেতরের গ্রন্থচিত্রণ, সচিত্রকরণ বা  ইলাস্ট্রেশনও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা মূলত ছবির মাধমেই গল্পের মধ্যে ঢোকে। ভালো গল্পের পাশাপাশি সুন্দর অর্থবহ ছবি, পরিষ্কার ছাপা, একটা আকর্ষণীয় বইও শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়তা করে, মনোজগতে ছাপ ফেলে। শিশুতোষ বইয়ের অলংকরণ করা আনন্দের কাজ। কিন্তু সহজ কাজ নয়। একটি শিশু যখন পড়বে, ছবির মধ্যে দিয়ে আগে পড়াটা বুঝে নিতে চাইবে। আবার পড়ার একটা একঘেয়েমি থাকে, এই একঘেয়েমি কাটাতে বইয়ের পাতায় ইলাস্ট্রেশন দরকার হয়। শিশুতোষ বইয়ের আঁকাআঁকি বা গ্রন্থচিত্রণের ক্ষেত্রে সচেতন এবং যতœবান হওয়া দরকার।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী একক প্রচেষ্টায় বিদেশিয়ানা থেকে অলংকরণকে কিছুটা মুক্ত করতে পেরেছিলেন। তার পথ ধরে সত্যজিৎ রায় প্রচ্ছদ ও গ্রন্থচিত্রণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।

ব্লকের দিন পেরিয়ে  অফসেটে ছাপার চল শুরু হয়েছে  তিন দশকেরও বেশি সময় আগে। প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে প্রচ্ছদ ও গ্রন্থচিত্রণে শিল্পীরা নানামুখী নিরীক্ষামূলক কাজও করছেন যেটা  কখনো আশাব্যঞ্জক কখনো হতাশামূলক। আর বর্তমানে বিশ্ব যখন হাতের মুঠোয় অর্থাৎ গ্লোবাল ভিলেজে নানামুখী কাজ হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ শিল্পের একটা আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হয়েছে। এবং আমাদের শিল্পীরা সেখানেও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত