দ্বিতীয় কিস্তি পেতে উদগ্রীব সরকার

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ০১:৪৬ এএম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে না পারলে সংস্থাটি ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করবে না। প্রথম কিস্তির ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদনের আগে এ শর্ত দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। সরকার রাজি হওয়ায় ঋণ অনুমোদন এবং প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় করেছে সংস্থাটি।

আগামী ডিসেম্বরে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের কথা রয়েছে। এখন দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পেতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন নির্দেশনা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে দফায় দফায় বৈঠক।

সূত্র জানায়, আইএমএফের শর্ত মানতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে আরেক দফা। রাজস্ব খাতের সংস্কারে এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) একের পর এক হিসাব কষছে। আইএমএফের কথামতো অতিরিক্ত রাজস্ব কোন খাত থেকে আদায় করা সম্ভব তার যোগ-বিয়োগ করছে। আসছে বাজেটে কোন কোন খাতে ভ্যাট অব্যহতি কমানো যায় তা নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে।

রাজস্ব খাতে আইএমএফের শর্তপূরণ করতে হলে আগামী তিন অর্থবছরে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে হবে। এর মধ্যে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই আদায় বাড়াতে হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। কর-জিডিপির অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩ করতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে কর-জিডিপির অনুপাত দিয়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। এ অর্থবছরে অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে হবে ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সর্বশেষ বছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলেছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এ অর্থবছরে এনবিআরকে বর্তমান আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত আরও ৯৬ হাজার কোটি টাকা আয় করতে হবে।

আইএমএফের এসব হিসাব সামনে রেখে চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসের ১৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি সামনে রেখেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এনবিআর বহির্ভূত খাত এবং এনবিআর খাতের জন্য মোট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বাড়িয়ে ধরার চিন্তা চলছে। এতে আসছে অর্থবছরেই লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা হবে কি না তা নিয়ে চলছে বৈঠক। নতুন অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ বা ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) হিসেবে এবং ৩৪ শতাংশ বা ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা আয়কর হিসেবে এবং ৩১ শতাংশ বা বাকি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুল্ক হিসেবে সংগ্রহ করার কথা বলা হতে পারে বলে জানা গেছে।

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপাস্তকে বলেন, ‘বাস্তব অবস্থার ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কাউকে খুশি করতে গিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না।’

আইএমএফের কথামতো নিয়মিত আদায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে এরই মধ্যে আয়কর আইন সংশোধন করে চূড়ান্ত করার কাজটি দ্রুত শেষ করতে নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটি কাস্টমস বা শুল্ক আইনের কাজটিও দ্রুত শেষ করতে বলেছেন। ঋণদানকারী সংস্থার সন্তুষ্টিতে এরই মধ্যে রাজস্ব জালের বিস্তার করতে ২০২৩ সালেই আরও ২০ লাখ করদাতা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। দাতা সংস্থার শর্ত মানতে বড়মাপের কর ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনবিআরে তলব করে পাওনা পরিশোধে বলা হয়েছে।

এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট গোয়েন্দা শাখার কাজে গতি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দাতা সংস্থার প্রস্তাব অনুসারে সম্ভাবনাময় বৃহৎ ও মাঝারি করদাতা চিহ্নিত করার কাজে জোর বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব আদায় কার্যক্রম মনিটরিং, আমদানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণা ও অবমূল্যায়ন সম্পর্কিত কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে, করদাতাদের সেবা বৃদ্ধি ও করদাতাদের সঙ্গে (খাতভিত্তিক) বেশি বেশি আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে রাজস্ব জালের বাইরে থাকা অনিবন্ধিত নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো জরিপে চিহ্নিত করে নিবন্ধিত কর শুরু করা হয়েছে।

ঋণ প্রদানের আগেই আইএমএফের শর্ত দেওয়া হয়েছে, নতুন করে কোনো খাতেই আর শুল্ক-ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া যাবে না। বর্তমানে যেসব খাতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া আছে, তা কমাতে হবে বা তুলে নিতে হবে। আইএমএফের এ প্রস্তাবে কোন কোন খাতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া আছে তা যাচাই-বাছাই করে এনবিআরের তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে কৃষি, পশুসম্পদ, মৎস্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা সেবা খাতে কোনো ভ্যাট নেই। উৎপাদন খাতে পোশাকশিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ারকন্ডিশনার, লিফট, মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোনসেট ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া আছে। ওষুধের প্রাথমিক কাঁচামাল উৎপাদনে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এভাবে জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ পণ্য সেবা ভ্যাট অব্যাহতির আওতাভুক্ত থাকায় ভ্যাট জিডিপি তথা কর জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না বলেও প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআর থেকে হিসাব করা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের চাপ না তৈরি করেও আইএমএফের শর্ত কতটা মানা সম্ভব।

অর্থ পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে জোরালো চাপ দিয়েছে আইএমএফ। ঋণদানকারী সংস্থাকে সন্তুষ্ট করতে এরই মধ্যে অর্থ পাচারে কে বা কারা জড়িত তার তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে ৩৩টি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাজে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। অর্থ পাচারকারীর এসব ব্যক্তির সন্ধানে তৎপরতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অতীতে পানামা, প্যারাডাইসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার সম্পর্কিত কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের যেসব নাগরিকের নাম উঠে এসেছিল তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়াও শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যাংক খাতে সংস্কার, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া, টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, প্রকল্পের কেনাকাটায় জবাবদিহি, স্বচ্ছতা আনাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিযোজন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাংক খাতের কী সংস্কার করা সম্ভব এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন কতটা সংশোধন করা সম্ভব তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কাজ করছে।

আইএমএফের দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়া যাবে এ বছরের ডিসেম্বরে আর শেষ কিস্তি পাওয়া যাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। এসব কিস্তির পরিমাণ ৭০ কোটি ৪০ লাখ ডলার করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত