রাত তখন ৯টার মতো হবে। সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে হেঁটে গেলে কিনব্রিজ খুব অল্প সময়ের পথ। ট্রেন থেকে নেমে অনায়াসে ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে যাই। কিন্তু যখন ব্রিজে উঠতে গেলাম, মনে হলো পাহাড়ে উঠছি। ওপরের দিকে উঠতে গিয়ে এবার শক্তিটা বেশি খরচ করতে হচ্ছে। আবার পাহাড়ের মতোই সামনের দিকে কি আছে পুরোপুরি দেখাও যাচ্ছে না। নিচ থেকে ওপরে উঠে মাঝখানে কিছুটা জায়গা সমতলের মতো। তারপর আবার ঢালু রাস্তা। এই ঢাল ধরে অন্যপাশ দিয়ে নামতে গিয়ে খরচ হওয়া শক্তিটা ফিরে পাওয়া গেল যেন।
সিলেটের সুরমা নদীর ওপরে প্রথম যে সেতু সেটা কিনব্রিজ, যা দুই ভাগে বিভক্ত নগরীকে সংযুক্ত করেছে। একপাশে সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশন, অন্যপাশে বন্দর বাজার। ফলে কিনব্রিজের বিশ্রাম নেই। সম্ভবত ক্লান্তি নেই। হাজার হাজার মানুষ, রিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের হালকা যানবাহন প্রতিদিন তার ওপর দিয়ে যাতায়াত করছে।
সুরমাতীরের দুপাড়ের মানুষের যোগাযোগের জন্য ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৩ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল কিনব্রিজ। লোহার কাঠামোতে দৃষ্টিনন্দন সেতুটি নির্মাণকাজ শেষে ১৯৩৬ সালে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল কিনের নামে এই সেতুর নামকরণ হয় কিনব্রিজ। দিনে দিনে সেতুটি দেশ ও বিদেশে সিলেটের প্রতীক হয়ে ওঠে।
কিনব্রিজের মাঝামাঝি পৌঁছেই মন খারাপ হয়ে গেছে। সিলেট আর কিনব্রিজ যেখানে সমার্থক সেখানে অনাদর আর অবহেলায় পড়ে আছে সেই ঐতিহ্যের স্মারক। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সেতুটি যান চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে কিনব্রিজ। বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে। একটু ভুল কিংবা অসতর্ক হলেই পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সেতুর দুপাশে সাইনবোর্ড ঝোলানো ‘ভারী যানবাহন চলাচল নিষেধ’। অর্থাৎ শুধু রিকশা, ভ্যানগাড়ি, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশাসহ ছোট ছোট গাড়ি চলাচল করতে পারে।
সেতুর মাঝামাঝি পৌঁছে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা পণ্যবোঝাই ঠেলাগাড়িকে দু-তিনজন মিলে ঠেলে ওপরে তুলছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল, রিকশা ঠেলে ওপরে তুলছেন এক যুবক। মনে পড়ল ছোটবেলায় পড়া ‘ধারালো বর্শার মতো স্বর্ণময় সূর্যরশ্মি ফলা/কীনব্রিজে আঘাত হানে/শুরু হয় জনতার চলা।’ ‘কীনব্রিজে সূর্যোদয়’ নামে সুরমাপাড়ের কবি দিলওয়ারের কবিতার এ পঙ্ক্তিগুলো।
ধনুকের মতো বাঁকা কিনব্রিজ। রাস্তা থেকে সেতুটি বেশ উঁচুতে হওয়ায় শুধু প্যাডেলের ওপর ভর করে পার হওয়া বেশ কঠিন। পণ্যবোঝাই ঠেলাগাড়ি একা টেনে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এজন্য রিকশা বা ঠেলাচালকের প্রয়োজন পড়ে ‘ঠেলাওয়ালার’।
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনির এই কাজ করেন ১০০-১২০ শ্রমিক। তারা ‘কিনব্রিজের ঠেলাওয়ালা’ হিসেবে পরিচিত।
সিলেটে রিকশার ইতিহাস আর কিনব্রিজের এই ঠেলাওয়ালাদের ইতিহাস একই। প্রতিবার রিকশা ঠেলে সেতুর ওপরে তুললে মজুরি ১০ টাকা করে পাওয়া যায়। পণ্যবাহী ঠেলাগাড়ি কিংবা ভ্যানগাড়ি ঠেললে ২০-৩০ টাকা করে একেকজন পান। পণ্য বেশি হলে ২-৪ জন একসঙ্গে ঠেলে সেতুর ওপরে তোলেন। দিন শেষে এক একজনের ৬০০-৯০০ টাকা উপার্জন হয়।
সেতুতে দাঁড়িয়ে কথা হয় ঠেলাওয়ালা আসমত মিয়ার সঙ্গে। তার বাড়ি রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায়। তিনি জানান, ১০ বছর ধরে এখানে ঠেলার কাজ করছেন। এটা বেশ কষ্টের হলেও স্বাধীন পেশা। কোনো পুঁজি লাগে না, কারও অধীনে কাজ করা লাগে না। মালিককে জমা দিতে হয় না। যখন ইচ্ছে কাজ করা যায়, ভালো না লাগলে বিশ্রাম নেওয়া যায়।
কালন মিয়া নামে আরেক ঠেলাওয়ালা বলেন, ১০ বছর একটানা ঠেলার কাজ করে অন্যকাজে চলে গিয়েও ছয় মাস পর ফিরে এসেছেন। তার ভাষায়, এ কাজে একটা নেশা আছে। আয় ভালো। কালন বলেন, ‘রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়া রিকশা ঠেলি। শরীরের ঘাম পায়ে ফেইলা ইনকাম করি। কষ্ট আছে, তৃপ্তিও আছে।’
শুধু যে যানবাহনে করে মানুষ যাতায়াত করে বিষয়টা এমন নয়। যতক্ষণ সেতুতে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার কাছে মনে হলো, যানবাহনের চেয়ে হেঁটেই বেশি মানুষ যাতায়াত করেন। এক পথচারী জানালেন, কিনব্রিজকে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ হাঁটার সেতু বলে বছর দু-এক আগে মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই সেতু টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দ্রুত সংস্কারকাজ প্রয়োজন।
‘মামা হাতকড়া (সাতকড়া) নিতায় নি। লুসাই ফাড়র (পাহাড়) হাতকড়া’ আবদুল লতিফ নামে এক সবজি বিক্রেতার ডাকে পেছনে ফিরে তাকালাম। শুধু আবদুল লতিফ নন, সেতুর উভয় প্রান্তে প্রায় ৪০-৫০টি ভ্রাম্যমাণ দোকান চোখে পড়ল। তারা সবজি, লেবু, নাগামরিচ (সিলেটের জনপ্রিয় মরিচ), মোবাইল সিম, ইয়ারফোন, টি-শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র বিক্রি করে থাকেন।
এক বিক্রেতা জানান, মাঝেমধ্যে পুলিশ এসে তাদের তুলে দিয়ে যায়, কয়েক দিন পর তারা আবার এসে বসে যান। অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে এখানে বিক্রি বেশি।
সেতুর বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সভা-অনুষ্ঠানের পোস্টার শোভা পাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে কবিরাজি ও হাকিমি চিকিৎসার লোভনীয় বিজ্ঞাপন। তেমনি এক বিজ্ঞাপন, ‘বিয়ে হচ্ছে না, বিদেশে যেতে পারছেন না, এখনই চলে আসুন হুজুরের কাছে’। দেশের অন্য যেকোনো জায়গায় হলে, বিদেশের জায়গায় চাকরি লেখা থাকত, কিন্তু সিলেটের মানুষ তো চাকরি নয়, বিদেশে যেতেই পছন্দ করেন।
কিনব্রিজের ঢাল বেয়ে নামতে নামতে চোখে পড়ল সিলেটের আরেক প্রতীকখ্যাত নিদর্শন আলী আমজাদের ঘড়ি। ছোটবেলা থেকেই মানুষের মুখে মুখে ‘চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি, আলী আমজাদের ঘড়ি, আর জিতু মিয়ার বাড়ি’ প্রবাদটি শুনে শুনে বড় হয়েছি। তখন মানুষ কিছুটা অহংকার নিয়েই নিজেদের ঐতিহ্যের এই ৩টি বিষয় নিয়ে গল্প করতেন।
আলী আমজাদের ঘড়ির বয়স হয়েছে ১৪৫ বছর। কিনব্রিজ এলাকায় সুরমা নদীর পাড় আর সারদা হলের মাঝখানে শহরের ‘জিরো’ পয়েন্ট। তার ঠিক ১০০ মিটারের মধ্যেই আলী আমজাদের ঘড়ির অবস্থান। কিনব্রিজ পার হয়ে বন্দর বাজার যাওয়ার পথে ঠিক প্রবেশমুখে লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির এই ঘড়ি। গুগল জানাচ্ছে, এ ঘড়ি স্থাপিত হয় ১৮৭৪ সালে। সিলেটের মানুষের রুচিবোধ আর শৈল্পিক হৃদয়ের এক বড় উদাহরণ এ ঘড়ি সিলেটের প্রতীক হিসেবে এখন দেশ-বিদেশে সুপরিচিত।
পথচারী স্থানীয় বাসিন্দা আফজাল হুসেন জানান, তৎকালীন বড়লাট সিলেট সফরে এসেছিলেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান ঘড়িটি নির্মাণ করেন। এর নাম রাখেন, নিজের ছেলে আলী আমজাদ খানের নামে। সেই থেকে আলী আমজাদের ঘড়ি নামেই এর পরিচিতি।
স্থানীয় আরেক পথচারী আক্ষেপ করে বলেন, আলী আমজাদের ঘড়ি কখন চলে, আর কখন বন্ধ থাকে কেউ জানেন না। প্রশাসন এই নিদর্শনটি টিকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই করছে না।
জানা গেল, কিনব্রিজ সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালে। কিন্তু আর হয়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, সেতুর মালিকানা মূলত সড়ক ও জনপদ বিভাগের। বিভাগীয় কমিশনারের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাধ্যমে সংস্কারকাজ করানোর। যদিও সেটা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
সিলেটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শন কিনব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ির বেহাল অবস্থা দেখে মন খারাপ নিয়েই ফিরে এলাম, ভাবলাম এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে স্থাপনা দুটি।
