জীবনধর্মী ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৩, ০২:৩০ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জীবনমুখী ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, একটি চলচ্চিত্র ব্যক্তির জীবন যেমন পরিবর্তন করতে পারে, তেমনি একটি সমাজকেও বদলে দিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা লক্ষ করবেন জীবনধর্মী চলচ্চিত্র যখন নির্মাণ করা হয় সেগুলো কিন্তু মানুষকে সব থেকে বেশি আকর্ষণ করে। কারণ মানুষ তার জীবনের প্রতিচ্ছবিটা সেখান থেকে পায়। আবার একটা সিনেমা পারে মানুষের জীবন পাল্টে দিতে বা সমাজের চিত্রটা পাল্টে দিতে।’

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২১ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

জীবনধর্মী সৃষ্টির গ্রহণযোগ্যতা সর্বত্র উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিনেমা, নাটক সব ক্ষেত্রেই অবদান রাখে, মানুষের চিন্তা-চেতনার আরও উৎকর্ষ ঘটাতে পারে এবং মানুষকে অন্যায়-অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারে।

তিনি বলেন, যারা আমাদের শিল্পী-সাহিত্যিক, যারা সাহিত্য রচনা করেন এবং যাদের রচনার ওপর ভিত্তি করেই সিনেমা হয় তারাও যদি এ রকম জীবনধর্মী রচনা তৈরি করেন, নাটক তৈরি করেন বা সাহিত্য তৈরি করেন আর তার ওপর ভিত্তি করে যদি সিনেমাগুলো হয় সেটা আমাদের সমাজটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, যেভাবে তার সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে, উন্নত করতে চাচ্ছে, মানুষের জীবনমান উন্নত করতে চাচ্ছে, মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে সেই সুযোগটা এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে।

প্রধানমন্ত্রী ২৭টি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২১-এর ৩৪টি পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মো. হুমায়ুন কবির খন্দকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের পক্ষে আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত অভিনেত্রী ডলি জহুর বক্তব্য রাখেন।

প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তিনি নিজেও আগামী বাজেটে উদ্যোগ নেবেন এই অনুদানটা বাড়িয়ে দেওয়ার। কেননা বরাদ্দ ভালো থাকলে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার মাঝে মেধা আছে, চিন্তাশক্তি আছে এবং শৈল্পিক মনোভাবটা আছে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, করোনাকালে অর্থনৈতিক মন্দা ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি দারুণভাবে বেড়েছে। সেখানে সরকার যে অনুদান দিচ্ছে, এটা একটা পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যথেষ্ট নয়। এই অনুদান আরও বাড়াতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি আমাদের কিছু চলচ্চিত্র হয়েছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং দেশের মানুষও সেগুলো লুফে নিয়েছে এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরেও সেগুলো চাহিদা পেয়েছে। কাজেই সেভাবেই আমাদের কাজ করা দরকার।

তিনি কষ্ট করে দেশের সিনেমা শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ায় কলাকুশলীসহ সংশ্লিষ্টদের সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি এফডিসিতে কমপ্লেক্স তৈরির কাজের ধীর গতিতে উষ্মা প্রকাশ করেন এবং কাজ দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গাজীপুরে নির্মাণাধীন ফিল্মসিটি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, তার সরকার ফিল্ম আর্কাইভ এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করে দিয়েছে। এখন প্রশিক্ষণটা জরুরি।

তার সরকারের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল। তাই এখন এই সেন্সর বোর্ড বাদ দিয়ে সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেটা আরও উৎকর্ষ সাধনের জন্যই করা হয়েছে। তবে নির্মাণাধীন চলচ্চিত্রে সমাজের জন্য ক্ষতিকর কিছু থাকলে সেগুলো অবশ্যই পরিহার করা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, সরকার যাতে ভবিষ্যতে সার্টিফিকেশন পদক্ষেপটা আইনগতভাবে নিতে পারে সেজন্য ব্যবস্থাটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, একসময় ছিল অশ্লীল সিনেমা, মারদাঙ্গা বা শুধু অনুকরণ করা। সেগুলো না করে ভালো জিনিসটা শিক্ষা নেওয়া আর মন্দ জিনিসটাকে পরিহার করা দরকার। সমাজের জন্য কোনটা ভালো সেটা বিবেচনায় আনা। যখনই চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন সে বিষয়টা দেখবেন। এমন সিনেমা দরকার বাবা-মা, ভাই-বোন, সবাই মিলে যাতে দেখতে পারে।

তিনি এ সময় শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমরা এ বিষয়টায় একটু পিছিয়ে আছি। এ ক্ষেত্রে আরও অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উচিত। এ ধরনের চলচ্চিত্র যারা নির্মাণ করবেন তাদের জন্য অনুদানটা আর একটু ভালোভাবে দেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।

অশ্লীলতা ও পাইরেসি বন্ধে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পাইরেসি বন্ধে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। সেটা হলে এগুলো বন্ধ হবে।

পুরনো চলচ্চিত্র বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো যেন হারিয়ে না যায় সেজন্য এগুলো ডিজিটালাইজড করে নতুনভাবে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও তিনি জোর দেন। কেননা এ চলচ্চিত্রগুলোর আবেদন কোনো দিনও শেষ হওয়ার নয়।

৯৬ সালে সরকারে আসার পর কলাকুশলী এবং সংশ্লিষ্টদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য মিডিয়া সেক্টরকে বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন আমাদের ৪৫টি টিভি চ্যানেল, ৩২টি কমিউনিটি বেতারের প্রচারকার্য পরিচালনা করা হচ্ছে, ২৭টি এফএম বেতারের অনুমোদন তার সরকার দিয়েছে। যেখানে আগে মাত্র একটি টিভি চ্যানেল ও একটি বেতার ছিল।

তার সরকারের অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং মিডিয়ার স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে দিনভর বিভিন্ন চ্যানেল ও টকশোতে সরকারের ঢালাও সমালোচনার পরও যারা বলেন যে, তারা ঠিকভাবে কথা বলার সুযোগ পান না, তাদের কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় অনেকে কথা বলে, টকশো হয়, সারা দিন অনেক কথা। অনেক কথা বলার পর কেউ কেউ বলবে আমরা কথা বলতে পারি না। অথচ বাংলাদেশে এখন ২৪৫৫টি পত্রিকা, ১৭০টি অনলাইন সংবাদ পোর্টাল, ১৪টি আইপি টিভি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে সবাই তো মন ভরে কথা বলছে। কথা বলতে পারল না-টা কোথায়। কে মুখটা বন্ধ করল আমি জানি না।’

তিনি বলেন, তার সরকার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের আগে বিদেশি মুদ্রায় স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে হতো। আর সরকার এখন দ্বিতীয় স্যাটেলাইটও উৎক্ষেপণের ব্যবস্থা নিচ্ছে, যাতে করে আবহাওয়ার তথ্যপ্রাপ্তি এবং সম্প্রচারে আরও উৎকর্ষ আসে। কেননা তার সরকার চায় এই শিল্পটা যেন সব সময় চালু থাকে, ভালো এবং উন্নতমানের থাকে।

শেখ হাসিনা এ সময় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটিকে আরও চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় করারও পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চলচ্চিত্র এমন একটা শক্তিশালী গণমাধ্যম যা দেশের মানুষের মনমানসিকতা বদলে তাকে আরও উন্নতমানের করে দিতে পারে, আর আমাদের জাতির পিতা স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, সে দেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে।’ বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত