সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা, দামিকরণ ও বাংলাদেশের বড়লোকি

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৩, ০২:০১ এএম

১৭৯৩ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য কুখ্যাত তৎকালীন ফরাসি রানী ম্যারি আন্তোনেতকে বিপ্লবীদের কর্র্তৃক মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এই ঘটনাকে অনেকে শোষিতের শ্রমের বিনিময়ে লাগামহীন বিলাসিতার কবর রচনা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফরাসি বিপ্লবের পর অতিবাহিত হয়েছে বহুকাল। শিল্পবিপ্লব, বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের দুনিয়াব্যাপী দখল এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান লাক্সারি কিংবা বিলাসিতার রূপ যেমন বদলে দিয়েছে, তেমনি ধনী কিংবা ‘বড়লোক’ শ্রেণির নানা অবস্থান ও চরিত্র নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের ধনী শ্রেণি প্রধানত শিল্পকারখানার মালিক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গ দ্বারা গঠিত। তবে ধনীদের একটি অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পেশার ওপর ভিত্তি করেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কোনো একক বর্গে ধনীদের বিচার না করা গেলেও, সামন্তবাদী ইতিহাসের দরুন ধনীত্ব নির্মিত হয়েছে মূলত ভোগের আচরণ বিবেচনায়। পুঁজিবাজারের বিশ্বায়নের যুগে নানা শ্রেণির পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের খরচের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘বড়লোকির’ স্মারক হিসেবে দামি পণ্য ভোগ করা দুনিয়াব্যাপী উপনিবেশের মাধ্যমে শোষণ করে ধনী হওয়া দেশগুলোতে ক্রমে তার জৌলুস হারাচ্ছে। যেহেতু ধনী আর দরিদ্র নির্ধারিত হয়ে এসেছে অপ্রয়োজনীয় খরচ করার ক্ষমতার ভিত্তিতে, সেহেতু অপেক্ষাকৃত দরিদ্রদের মাঝে খরচের ক্ষমতা ও ভোগ প্রদর্শনের চর্চা বৃদ্ধি পাওয়ায় অবস্তুগত আচরণ, শিল্প কিংবা লাইফস্টাইল ভোগ করতে পারার ক্ষমতা ধনীত্বের প্রতীক হিসেবে স্থান দখল করছে। যেমন, রোলেক্স ঘড়ির রেপ্লি­কা কিনতে পারা গেলেও, অর্গানিক খাবার খাওয়া, নিরামিষাশী জীবনযাপন, যোগব্যায়াম, চিত্রকর্ম কেনা কিংবা বুঝতে পারা ইত্যাদি আচরণ অর্জন করতে পয়সা খরচ করাটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়, ফলে তা ধনী-দরিদ্রের ফারাক নির্মাণ করতে সক্ষম।

বাংলাদেশে এই বাস্তবতা এখনো কিছুটা ভিন্ন। সামন্তবাদী ইতিহাসের ছাপ এখনো বিদ্যমান থাকায় ফলে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের খরচভিত্তিক ‘বড়লোকির’ পাশাপাশি বংশপরিচয়, পারিবারিক ঐতিহ্য ও ঠাটবাট এখনো ধনীত্বের পরিচায়ক হিসেবে সমাদৃত। আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ধনী আর বংশপরম্পরায় ধনী হওয়া সাংস্কৃতিক আচরণগত পার্থক্য বহন করে এবং মূলত পরবর্তী অংশটিই ‘বড়লোকের’ সংস্কৃতি নির্মাণ করে।

বাংলাদেশে ধনীদের সংস্কৃতি নির্ধারিত হয় বিভিন্ন দামি ক্লাব ও দুরূহ মাপকাঠিভিত্তিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ, পশ্চিমা কূটনীতিকদের সংস্পর্শে আসা/ক্লাবগুলোতে গমনাগমনের ক্ষমতা, নব্য-সামন্তবাদী কিংবা পশ্চিমা ফ্যাশনের নকল করা ডিজাইনার দামি পোশাক কিংবা বহুমূল্য পণ্য ও সেবা খরিদ করার ক্ষমতা (পোরশে গাড়ি কিনতে পারা, অডি গাড়ির মালিকানা, ডেস্টিনেশন ভ্যাকেশন কাটাতে পারা), পাশাপাশি কিছুটা অরাজনৈতিক সচেতনতাবোধ, পশুপ্রেম কিংবা পরিবেশবাদিতাসহ সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয়তা যা প্রধানত, শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা ও ভোগকারী হিসেবে হাজির হওয়া ইত্যাদি মানদন্ডের ভিত্তিতে।

এরই সাথে যুক্ত হয়েছে যৌন শোষণ ভিত্তিক সুগার ড্যাডি/মমি সম্পর্ক, কালো টাকা সাদা করার লক্ষ্যে নানান বিনোদনমূলক এবং করমুক্ত দাতব্য প্রকল্প - যা ধনীদের সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। লাক্সারির সাথে লাস্ট/কামের বুৎপত্তিগত অর্থের সম্পর্ক বাংলাদেশেও বলবৎ আছে, ফলে খরিদ করার বাসনা চরিতার্থের সাথে সাথে ‘বড়লোকের সংস্কৃতি’ বিষমকামী ধনী পুরুষের সুগার বেবি কিংবা যৌনদাস/দাসী ‘খরিদ’ করতে পারার ক্ষমতা এবং প্রয়োজনে ইমেজ উদ্ধারে জনমত পরিবর্তনের ক্যাম্পেইন পরিচালনার সামর্থ্যরে ওপরেও নিভর্রশীল। আবার, সমাজের আধিপত্যশীল মূল্যবোধ পরিবর্তনের সংগ্রাম দীর্ঘ হলেও ধনীত্ব নির্মাণ প্রকল্প অর্থ দিয়ে অভিজাত দেয়াল তুলে এই কাঠামো অতিক্রমের সুযোগ তৈরি করে এবং একই কাঠামোতে জনসাধারণের অনতিক্রম্যতার সাথে বিভেদ তৈরি করে পরিবর্তনকে সাংস্কৃতিক বিলাসিতায় পরিণত করে। ফলে সর্বজনের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম বড়লোকের দ্বারা অর্থের মতোই লুন্ঠিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আলস্য করতে পারাটা ঐতিহাসিকভাবে ধনীক/অলস শ্রেণির স্মারক হলেও, বিলাসবহুল সক্রিয়তা বর্তমানে আলস্যকে প্রতিস্থাপন করছে। দামি জিমের কিংবা ব্যায়ামবিদের সাবস্ক্রিপশন, রাতভর পার্টি করতে পারা, বিদেশে ব্যবসা বর্ধনের উদ্দেশ্য নিয়মিত ভ্রমণ এবং ক্রীড়ামোদ ধনী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।  বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তীয় শিল্প-সংস্কৃতির প্রসার ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে এই প্রসারের গতি ধীর হলেও, বর্তমানে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। ফলে লাখ টাকার বই ও শিল্পকর্মের বাজার তৈরি হয়েছে।

বিলাসিতা করতে পারাটা ধনীত্বের চরিত্র নির্মাণ করে বিধায় পরিবর্তনশীল পুঁজিবাজারে বিলাসিতারও বহু ধরন তৈরি হয়ে চলেছে। বিলাসী খরচের মূল লক্ষ্য দূরত্ব কিংবা ফারাক নির্মাণ করা দাম এ ক্ষেত্রে প্রধান নির্ধারক। ফলে কোনো দ্রব্য বা সেবা দামি হিসেবে মর্যাদা হারালে দ্রুতই নতুন পণ্য ও সেবার দামিকরণ করা হয়। যেমন, ইউরোপীয় ও ভারতীয় সামন্ত ঐতিহ্যবাহী নকশা ও শিল্প অধিক বাজারজাতকরণ ও বহু পুনঃমুদ্রণের ফলে তার আবেদন হারালে রিকশা পেইন্ট করা লাখ টাকার ব্র্যান্ডেড স্যুট রিকশা শিল্পের সহজলভ্যতাকে স্যুটে স্থানান্তরের মাধ্যমে রিকশা শিল্পের দামিকরণ করে। দামিকরণের প্রেক্ষাপট ও ব্যবহার (অর্থাৎ গুলশান/বনানীর স্টুডিওতে বসে বানানো ডিজাইন, ডিজাইনারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় এবং সোর্সিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংসতা ঘটানোর ক্ষমতা) এবং অবশ্যই দাম নিজেই এ ক্ষেত্রে দূরত্ব নির্মাণের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। যেহেতু সংসদীয় ক্ষমতা বহুলাংশে ধনীদের দ্বারা অধীকৃত ফলে ধনী সংস্কৃতিতে জাতীয়তাবাদী রূপ দৃশ্যমান করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ধনীদের জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি ধারণ করার জন্য দামিকৃত রিকশাশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তবে দৌলতের উৎস (গার্মেন্টস খাতের শোষণ, ভূমি দখল কিংবা ব্যাংক থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক খাতের লুন্ঠন) নির্বিশেষে বাংলাদেশের ‘বড়লোকেরা’ এখনও ভারতীয় ও ঔপনিবেশিক শাসক/ধনীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের ভোগ আচরণ নির্মাণ করে চলেছেন বিধায় জাতীয়তাবাদী পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রে ধনীদের সম্ভাব্য ভূমিকা অর্থনৈতিক লুন্ঠন আর সাংস্কৃতিক অনুকরণ/কুক্ষিগতকরনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত