যেকোনো অঞ্চলের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে সেই অঞ্চলের মানুষের পোশাক, কথা, আচার আচরণ যেম ন অনুষঙ্গ তেমন তাদের খাদ্য বা খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ধরা হয়। তাই খাদ্যকে সাংস্কৃতিক নির্মাণ বলা যায়। পপুলার কালচার বা জনসংস্কৃতির একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষের পছন্দের খাবার খুব দ্রুত বদলায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফাস্টফুড কিংবা কন্টিনেন্টাল খাবারের জনপ্রিয়তার তোড়ে দেশীয় অনেক খাবার হারিয়ে যায়। বাংলাদেশেও এমন হয়েছে যে অনেক খাবারের নিত্য ব্যবহার হারিয়ে যেতে বসেছে যেমন পান্তা ইলিশ হয়ে গেছে শুধুমাত্র পহেলা বৈশাখের খাবার অনেকের কাছেই। বাংলাদেশে বিভিন্ন বিভাগের যেসব আঞ্চলিক খাবার বা খাবারের প্রথা আছে সেসবও জনসংস্কৃতির চাপে টিকতে পারছে না বললেই চলে। কিন্তু এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের মেজবানকে বেশ ব্যতিক্রম বলা যায়। যেখানে ফাস্টফুড বা রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতির জোয়ারে নিজস্ব খাবারগুলো আমরা ভুলতে বসেছি সেখানে দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় মেজবানের মাংস বা খাবারকে কেন্দ্র করে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা চালু হয়েছে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান কীভাবে জনসংস্কৃতির সঙ্গে মিশে টিকে গেল এটা একটা বিস্ময়ই বটে! চট্টগ্রাম এবং মেজবান সমার্থক শব্দ যেন। মেজবান চাটগাঁর আঞ্চলিক ভাষায় মেজ্জান বলে পরিচিত শব্দটি এসেছে মূলত ফার্সি ভাষা থেকে যার অর্থ ‘অতিথি আপ্যায়নকারী’ বা ‘নিমন্ত্রণকারী’ আর ‘মেজবানি’ অর্থ ‘মেহমানদারী’। পনেরশ শতাব্দীর প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে ‘মেজোয়ান’ বা ‘মেজোয়ানি’ শব্দ পাওয়া যায় যার মানে আপ্যায়নকারী ও আপ্যায়ন। লেখক রশিদ আনামের প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে ১৪শ শতকের আগে চট্টগ্রাম যা আরাকান রাজ্যের অন্তর্গত ছিল এর জনসংখ্যার অধিকাংশই ছিল হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। সেই সময় চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে এবং প্রসার লাভ করে. সুলতানি আমলে আরব, পারস্য এবং তুরস্ক থেকে বিভিন্ন পীর-আউলিয়া আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারে। ইসলাম ধর্ম প্রচারকরাই মূলত ধর্মান্তরিত মুসলমানদের নতুন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে ভোজের আয়োজন করেন যার নাম মেজবান রাখা হয়, এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল নব্য মুসলমানদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সেই থেকে চট্টগ্রামে বিশাল ভোজের আয়োজন করে লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোকে মেজবান বলা হয়, তবে নতুন মুসলমানের সঙ্গে পরিচিত করানোর উপলক্ষ দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে মেজবানির আয়োজন করা হয় অন্য কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যেমন কেউ মারা গেলে তার কুলখানি বা চল্লিশায়, মৃত্যুবার্ষিকীতে, জন্মবার্ষিকী, আকিকা, বিয়ে, খৎনা, কান ফোঁড়ানো থেকে শুরু করে যেকোনো উপলক্ষেই চট্টগ্রামে মেজবানির আয়োজন করে প্রতিবেশী এবং আত্মীয় স্বজনদের খাওয়ানোর রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মেজবান শুধুমাত্র চট্টগ্রামে মুসলিম পরিবার আয়োজন করে থাকে তা নয়, চট্টগ্রামেই কোনো কোনো হিন্দু/বৌদ্ধ অধ্যুষিত অঞ্চলেও হিন্দু বা বৌদ্ধ পরিবারে মেজবানের আয়োজন হয় খাসি, মুরগি, মাছ, শুঁটকি ভর্তা সহযোগে। অনেকেই ভাবেন মেজবান নিজেই একটি খাবারের নাম, আসলে তা না, মেজবান হলো বিশেষ কিছু খাবার পরিবেশন করে যে ভোজ আয়োজন করা হয় তা সেই বিশেষ খাবার কোনো পোলাও কোরমা বিরিয়ানি নয়, একদমই সাধারণ আতপ চালের সাদা ভাত, গরুর মাংস, নলার ঝোল (গরুর পায়ার ঝোল যাকে অন্য অঞ্চলে নেহারি বলে) এবং লাউ-ডাল (মাসকলাই বা বুটের) দিয়ে ছোট হাড়-মাংস মূল পদ। এর সঙ্গে কোনো কোনো মেজবানে কালা ভুনা, মুরগির মাংস বা মাছ পরিবেশন করা হয়, মেজবানের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই, সকাল বা দুপুর বা সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলে। মেজবানির উৎপত্তি হয় চট্টগ্রামের বনেদি ধনী পরিবারগুলোয় প্রথম দিকে কিন্তু কালক্রমে তা ছড়িয়ে গেছে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারেও। চট্টগ্রামে মেজবান দেওয়াটা যেন অনেকটাই ইজ্জত রক্ষার ব্যাপারও বটে। তখনকার দিনে পিতল বা তামার ডেকচিতে রান্না করা হতো মাংস। যে ডেকচিতেই রান্না হোক না কেন চট্টগ্রামের ভাষায় একে ‘ডেক পাকানো’ বলে। আগে নিচে চাটাই বিছিয়ে বসা হতো আর বালতি ভরে খাবার এনে চামচে বেড়ে দেওয়া হতো। এখন চেয়ার টেবিল পেতে বাটিতে দেওয়া হয় খাবার। এমনকি মেজবান শেষে যদি খাবার রয়ে যেত তবে নিয়ম হলো পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের বাড়িতে টিফিন বক্স ভরে পাঠানো। দাওয়াত দেওয়ার নিয়ম ছিল মাইক বাজিয়ে, এখন কার্ড বা ফোনে দেওয়া হয়। কখনো কখনো প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। যেমন ওই বাড়িতে দুটো গরু দিয়ে মেজবান দিলে এই বাড়িতে ৪টা দিয়ে দেওয়া হবে ধরনের বাড়াবাড়ি চলে। এতে টাকার শ্রাদ্ধ আয়োজনকারীর হলেও মজাটা যারা খেতে আসে তাদের হয় বলাবাহুল্য। মেজবানের মাংস রাঁধতে পুরুষ বাবুর্চির দেখাই মেলে। এর কারণ সম্ভবত কয়েকশ বা হাজার মানুষের জন্য বড় ডেকচিতে বা পাত্রে রান্না করতে যে শক্তি লাগে তা আমাদের সংস্কৃতিতে নারীর পক্ষে সম্ভব না অমন ধারণা থেকে পুরুষ বাবুর্চির হাতেই মেজবানি মাংস রান্না হয়। মেজবানি মাংস রান্নায় বিভিন্ন রকমের মসলার ব্যবহার করা হয় লাল মরিচের সঙ্গে মিশিয়ে। সরিষার তেল বেশি ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় ধরে কাঠের চুলায় জাল দিয়ে সেদ্ধ করা হয় যাতে মসলা ভালো করে মাংসের ভেতর ঢুকে মাংস নরম হয় তার জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার কারণে মাংসের স্বাদ বেড়ে যায়। মাংসের স্বাদের জন্যই সম্ভবত এটি আঞ্চলিক সীমানা পেরিয়ে এখন দেশের সবখানে এবং বিদেশেও জনপ্রিয় হয়েছে।
চট্টগ্রাম শহরে রেস্টুরেন্ট কালচারেও মেজবান ঢুকে গেছে আলাদা মেন্যু হিসেবে। অনেক হোটেলে প্রতি সপ্তাহে বিশেষ করে শুক্রবারে আলাদা করে গরু জবাই করে মেজবানেই মাংস রান্না করা হয়। আবার রেস্টুরেন্টের নাম ‘মেজবান হোটেল’ বা ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’ ইত্যাদি রাখা হচ্ছে ভোজনরসিকদের আকৃষ্ট করার জন্য। শুধু পার্থক্য হলো এখানে মেজবানের মাংস ফ্রিতে খাওয়া যায় না যেটা ঐতিহ্যগতভাবে মেজবানের (অর্থ মোতাবেক) বৈশিষ্ট্য। তবে এভাবে হলেও যারা চট্টগ্রামে অন্য অঞ্চল থেকে বেড়াতে আসছেন বা বিদেশ থেকে আসছেন এসব রেস্টুরেন্ট বা হোটেলে মেজবানি মাংস খেয়ে দুধের স্বাদ কিছুটা হলেও ঘোলে মেটাতে পারেন।
