বামপন্থিদের আত্মম্ভরিতা ও মমতার ইউএসপি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৩, ১১:০২ পিএম

কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এক উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যে লেজেগোবরে হয়েছে, এটা সবাই নিশ্চিত জানেন। লেজেগোবরে শব্দ আপত্তিকর মনে হলে, সোজাসুজি বললে, সাগরদীঘি উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাসের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে গেছেন। ঠাকুমা কবি বায়রনের ভক্ত ছিলেন বলে নাতির নাম রেখেছিলেন বায়রন। নাতি ঠাকুমার মর্যাদা রেখেছেন রোমান্টিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে হেলায় হারিয়ে।

আপনি বলবেন, একটা বাই ইলেকশন জিতলে তো আর বলা যাবে না যে মমতা ব্যানার্জির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে বা কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর জোট যেভাবে সাগরদীঘি জিতল, ঠিক সেভাবেই আগামীদিনেও পঞ্চায়েত ভোটে জিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে দুর্দান্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। একেবারেই তা নয়। কোনো রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, তিনি যত বড় পণ্ডিত হোন না কেন এ রকম কথা এখনই কল্পনাও করতে পারবেন না এটা ঠিক।

একটা কথা, আমার বাম, কংগ্রেস বন্ধুরা যত রাগই করুন, তবু বিষয়টি না বললে, এ রাজ্যের রাজনীতি নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা হয়ে যাবে, তা হচ্ছে হাজার নিন্দেমন্দ সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে জননেত্রী একজনই। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আমি গ্রামের পর গ্রাম ঘুরি, সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখনো ‘দিদি’ভক্ত। মহিলাদের মধ্যে অন্তত ৮০ শতাংশ চোখ বুজে মমতার দলকে ভোট দেবেন আজকেই যদি ভোট হয়। মমতা ব্যানার্জির ইউএসপি (ইউনিক সেলিং পয়েন্ট) হচ্ছে, ‘আমি তোমাদের লোক’ এই ইমেজ নির্মাণ করে তা জনমনে চারিয়ে দেওয়া। তা ছাড়া তৃণমূল সরকারের নানা সামাজিক প্রকল্প নিশ্চিত সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।

মমতার এই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ভাঙতে বিরোধী দলের প্রথমে দরকার এক, জননেতা। যিনি সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের ভাষা বুঝবেন। বলতেও পারবেন। অন্য দলের সে ক্ষমতা কোনো দিনই ছিল না। আজও নেই। বিজেপির রাজনীতি পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক, মেরুকরণের। কংগ্রেস কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ। একমাত্র বামপন্থি রাজনীতির পক্ষেই সম্ভব মমতার পপুলিস্ট রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানানো। মুশকিল হচ্ছে দীর্ঘদিন শাসনক্ষমতায় থাকার কারণে, তাদের একদা যে মূল শ্রেণিভিত্তি, গ্রামের গরিব কৃষক, নিম্ন আয়ের লোকজন বা অসংগঠিত শ্রমিক, অধিকাংশ আজও দলের বাইরে থেকে গেছে। বামপন্থি রাজনীতিতে একজন জননেতা নেই। যারা আছেন, সবাই পার্টি নেতা। আমজনতার মধ্যে সে রকম কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই।

বামপন্থি রাজনীতিতে আত্মম্ভরিতা এখনো অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। নেতৃত্বের সিংহভাগ মধ্যবিত্ত। সমাজমাধ্যমে কোনো সামান্য সমালোচনা সহ্য করার ঔদার্য খুব কম বাম সমর্থকদের আছে। মমতার বিরুদ্ধে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনীতি নয়, ব্যক্তিগত আক্রমণে দস্তুর এই নিম্ন মেধার বাম কর্মী, সমর্থকদের। বোঝা যায় নীতির লড়াইয়ের চেয়েও বড়সংখ্যক বাম সমর্থকরা মমতার ওপর হাড়ে চটা, তাদের সাধের রাজ্যপাট ভদ্রমহিলা কেড়ে নেওয়ায়। কিন্তু রাগ বা হিংসা দিয়ে তো আর রাজনৈতিক লড়াই জেতা যায় না।

জিততে গেলে অনেক পথে পার হতে হবে বাম-কংগ্রেস জোটকে। জোট হচ্ছে এটা মোটামুটি নিশ্চিত। যদিও রাজনীতিতে কোনো পূর্বাভাস সব সময় ঠিকঠাক মেলে না। তবে এখন যা পরিস্থিতি, তাতে জোট না করলে দুপক্ষের কাছেই তা হবে রাজনৈতিক হারিকিরি।

মনে হয় না সে ভুল বাম-কংগ্রেস করবে। তৃণমূল এ মুহূর্তে খানিকটা হলেও ব্যাকফুটে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। মমতার সামাজিক কর্মসূচি সফল হতে পারত যদি তার কোনো শক্তপোক্ত, আদর্শবাদী দল থাকত। তৃণমূলের না আছে আদর্শ, না রাজনৈতিক দীক্ষা। বস্তুত তৃণমূল এক রামধনু জোট। এ জোটে কংগ্রেসের চরম দক্ষিণপন্থি অংশ থেকে চরম বাম, নকশালপন্থিদের বিচিত্র সহাবস্থান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল রাজনৈতিক পুঁজি হচ্ছে অন্ধ বামপন্থি রাজনীতির বিরোধিতা।

মমতা ব্যানার্জির পক্ষের অনেকেই দলকে এক ধরনের সাব-অলটার্ন ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই তিনি বস্তি থেকে উঠে এসেছেন বলে বাবু ভদ্দরলোকরা তার বিরোধিতা করে চলেছেন বা অনুব্রত মণ্ডল সামান্য মাছ বিক্রেতা ছিলেন বলে ইডি, সিবিআই তাকে এমন হেনস্তা হতে হচ্ছে ইত্যাদি।

আমাদের বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে বামুনবাদী ঝোঁক প্রবল বলে মমতাপন্থিদের বক্তব্য পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেন্দ্রীয় সরকার ইডি বা সিবিআইকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করতে ব্যবহার করছে এই অভিযোগ নিঃসন্দেহে ঠিক।

তার মানে এই নয় যে, মমতা ব্যানার্জির রাজনীতির সঙ্গে গ্রামশি, নিদেনপক্ষে মওলানা ভাসানীর নিম্নবর্গীয় রাজনীতির বিন্দুমাত্র মিল রয়েছে। মমতার শ্রেণি রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে মূলত শহুরে বেকার, বস্তিবাসী, ছোট পুঁজির দোকানদার ও গ্রাম, মফস্বলের সুবিধাবাদী অংশ। মমতার রাজনৈতিক ডিসকোর্স যত না সাব-অলটার্ন, ঢের বেশি লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের সাযুজ্য।

এসব তাত্ত্বিক কচকচি যদি বাদ দিইও, তাহলেও তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি এ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এমন কোনো জেলা, ব্লক নেই, যেখানে টিএমসির নেতাকর্মীদের চুরি নিয়ে লোকজন কথা বলে না। পার্থ চট্টোপাধ্যায়সহ প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী থেকে দপ্তরের বড়-ছোট কর্তা এখন জেলে।

অপরাধের বিচার চলছে, দোষী বলা যাবে না। তবু এটা ঠিক যে, কোটি কোটি টাকা যেভাবে তৃণমূল ঘনিষ্ঠদের কাছে খোলাখুলিভাবে পাওয়া যাচ্ছে, তা লোকের চোখে ভালো ঠেকছে না। পাশাপাশি বামপন্থিদের সমালোচনা করলেও এটা অস্বীকার করা যাবে না, এখনো তাদের মধ্যেই অসংখ্য সৎ আদর্শবাদী জনতার ভিড়।

দূর গ্রামে যান, দেখবেন মমতার লুম্পেন বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনের হামলার মুখে দাঁড়িয়েও লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করছে অসংখ্য আদর্শবাদী তরুণ। সাগরদীঘি নিশ্চিত মমতার মৃত্যুঘণ্টা বাজায়নি। কিন্তু অশনিসংকেত পৌঁছে দিয়েছে। সেটা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, মমতা স্বয়ং তা বুঝতে পেরেছেন। হারের পর থেকে প্রথম টিভি বক্তৃতায়ও এখনো তার শরীরের ভাষায় আগের মতো আত্মবিশ্বাসী লাগছে না।

অধীর চৌধুরীর মেয়ের আত্মহত্যা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ অনেকেরই ভালো লাগেনি। আসলে সাগরদীঘি নির্বাচনে মমতার বড় উদ্বেগের কারণ তার সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের ধস। মমতা ব্যানার্জি ইদানীং বড় বেশি গঙ্গা আরতি ও অন্যান্য হিন্দু আচার নিয়ে যত মাতামাতি করছেন, তত মাইনরিটি ভোট কমছে। আরও কমবে। আইএসএফ নেতা নৌশাদ সিদ্দিকীকে মিথ্যে অভিযোগে জেলে রাখাও এ রাজ্যের মুসলমানরা ভালোভাবে নেননি। ফলে সাগরদীঘি নিছক একটি সিট নয়। ভবিষ্যতে এই আসনটিই হতে পারে তৃণমূলের কাছে চরম বিপদের।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত