মূলধন সংকট ও আমানত ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার কারণে গত শুক্রবার বন্ধ হয়ে যায় ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক। ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন (এফডিআইসি)। এর তিন দিনের মাথায় গত রবিবার বন্ধ ঘোষণা করা হয় নিউইয়র্ক ভিত্তিক সিগনেচার ব্যাংকও। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অব ফিন্যান্সিয়াল প্রটেকশন অ্যান্ড ইনোভেশন। গ্রাহকদের আতঙ্ক দূর করতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আশ্বাসও দিয়েছেন। বলেছেন, গ্রাহকদের অর্থ পুরোপুরি নিরাপদ এবং সে জন্য যা যা দরকার, সবই তার সরকার করবে। কিন্তু তাতেও লাভের লাভ কিছু হয়নি। মাত্রা তিন দিনের ব্যবধানে দুটি ব্যাংকের পতনের ঝাঁকুনি লেগেছে বিশ্বজুড়ে। গত সোমবার ও গতকাল মঙ্গলবার দুই দিনেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর, এই পতনের ধাক্কায় অন্য ব্যাংকও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। আর তাতেই বিশ্বজুড়ে ব্যাংকের শেয়ারের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। সোমবার দিনের শুরুতে স্পেনের সানতানদার এবং জার্মানির কমার্স ব্যাংকের শেয়ার একটা সময় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তবে ইউরোপের ব্যাংকগুলোর চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ছোট ব্যাংকগুলো আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।
বিবিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর বাজার মূলধন কমেছে ৯০ বিলিয়ন বা ৯ হাজার কোটি ডলার। এ নিয়ে গত চার দিনে তাদের বাজার মূলধন হ্রাসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯০ বিলিয়ন বা ১৯ হাজার কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে আঞ্চলিক ব্যাংক। ফার্স্ট রিপাবলিক ব্যাংকের শেয়ারদর ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে। এমনকি সেই ব্যাংকে নতুন বিনিয়োগ আসছে এমন খবরও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। এ ছাড়া ইউরোপের স্টক্স ব্যাংকিং সূচকের পতন হয়েছে ৫ দশমিক ৭ ও ক্রেডিট সুসির পতন হয়েছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এশিয়ায় জাপানের ব্যাংকিং উপসূচক ডটআইবিএনকেএস ডটটির পতন হয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করতে পারে বলে একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বৃদ্ধির ওই পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে গিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ও বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সুদহার বাড়িয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে দ্বিতীয় বড় পতনের ঘটনা এটা। এর আগে ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার মধ্যে অর্থ সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন মিউচুয়াল ব্যাংকের কার্যক্রম স্থগিত করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার সম্পদমূল্য ছিল ৩০৭ বিলিয়ন ডলার।
বিবিসি লিখেছে, তাদের উত্তর আমেরিকার প্রযুক্তি প্রতিবেদক জেমস ক্লেটন সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে ওই ব্যাংকের শাখার সামনে টাকা তোলার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। ব্যাংক ইলেকট্রনিক ট্রান্সফার বন্ধ রাখায় তাদের চেক ভাঙিয়ে টাকা তুলতে হচ্ছিল। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পতনে বড় ধাক্কা খায় প্রযুক্তি খাত। এর প্রভাব শুধু আমানতে নয়, ঋণ কার্যক্রম ও অন্যান্য অর্থায়নেও পড়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এর মধ্যেই সিগনেচার ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় এফডিআইসি।
