মডেল প্রভাবশালীরাও আরাভ ‘কানেকশনে’

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৩, ০২:০৩ এএম

বাংলাদেশ ও দুবাইয়ে আলোচিত আরাভ খান নামধারী রবিউল ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় চলছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

পুলিশ সূত্র বলছে, অল্প সময়ে কোটিপতি হওয়া আরাভ খানের সঙ্গে দেশের অপরাধজগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী, মডেল, পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি সামনে আসছে।

গত বুধবার আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আরাভ খানের স্বর্ণের দোকান ‘আরাভ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। ওই অনুষ্ঠানে সাকিব ছাড়াও চলচ্চিত্র নির্মাতা ও উপস্থাপক দেবাশীষ বিশ্বাস, আলোচিত হিরো আলমসহ বিনোদনজগতের আরও কয়েকজনকে দেখা গেছে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের প্রচারিত খবরে।

আরাভ খান নামধারী রবিউল ইসলাম ২০১৮ সালে পুলিশ কর্মকর্তা মামুন ইমরান খান হত্যাকা-ের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। তিনি সোহাগ মোল্লা, আপন, হৃদয় এসব নামেও পরিচিত। ওই ঘটনার পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে আরাভ খান নামে পাসপোর্ট করিয়ে দুবাইয়ে চলে যান।

পুলিশ সূত্র জানায়, আরাভের সোনা কারবারে জড়িয়ে পড়ার পেছনে আলোচিত এক মডেল ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আছেন, যারা ২০২১ সালে মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাদের যোগসাজশে সোনা কারবারে এসে দুবাইয়েও গড়ে তুলেছেন স্বর্ণের ব্যবসা। এ ছাড়া মামলা থেকে রেহাই পেতে নিজের নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন, এমন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তারও আশকারা পেয়েছেন তিনি। পুলিশ, ব্যবসায়ী ও মডেলরা দুবাইয়ে গেলে তার সান্নিধ্য পান। সোনার দোকান উদ্বোধন হওয়ার পর ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান দেশে এলেও অন্য অতিথিরা রয়ে গেছেন দুবাইয়ে। ইতিমধ্যে আরাভের সহযোগীদের একটি তালিকা তৈরি করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।  

পুলিশ সূত্র জানায়, অপরাধজগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও জয় ছিল আরাভের অন্যতম সহযোগী। তাদের মাধ্যমে গুলশান ও বনানী এলাকার নামী মডেলদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পাশাপাশি দুই শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গেও সখ্য গড়ে ওঠে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসার পাশাপাশি সোনা চোরাচালানেও জড়িয়ে পড়েন। দুবাইয়ে গড়ে তোলেন আলিশান সোনার দোকান। ওই দোকানের ব্যবসায়িক পার্টনার পুলিশের দুই সাবেক কর্মকর্তা ও দুজন বড় ব্যবসায়ী। ওই ব্যবসায়ীরা গুলশান ও বনানী এলাকায় পরিচিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুলশান এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার সঙ্গে আরাভসহ বেশ কয়েকজন রাঘববোয়াল জড়িত। আলোচিত সেই মডেল ও চলচ্চিত্র প্রযোজক ওই হত্যাকা-ের বিষয়ে অনেক কিছুই জানেন। তারা আরাভের সঙ্গে দেখা করতে নিয়মিত দুবাই যান। ওই চলচ্চিত্র প্রযোজক ও মডেল বর্তমানে দুবাই অবস্থান করছেন বলে তারা জানেন।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২ আগস্ট রাতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একাধিক টিম রাজধানীর বারিধারায় মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার বাসায় অভিযান চালায়। ওই সময় বিপুল পরিমাণ মাদকসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ধনাঢ্য পরিবারের উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের তাদের বাসায় মাদক সেবনের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং ওই সব ছেলে-মেয়ের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তুলে তাদের বাবা-মা-আত্মীয়স্বজনদের ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে এই দুজনের বিরুদ্ধে।

পুলিশের একটি সূত্র বলছে, পিয়াসা ও রাজকে জামিনে কারাগার থেকে বের করে আনার জন্য আরাভ মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছিলেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরাভ ঠান্ডা মাথার অপরাধী। সোনা চোরাচালান করেই কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দুবাইয়ে তার সোনার দোকান উদ্বোধন করতে সাকিবের যাওয়া ঠিক হয়নি। অর্থের প্রয়োজন সবারই আছে। তবে সাকিবের মতো তারকার টাকার পেছনে ছোটা খুবই দুঃখজনক। সাকিব ও হিরো আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ পিয়াসা, নজরুল রাজ, ব্যবসায়ী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আরাভের ভালো সম্পর্ক থাকার বিষয়টি জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী ও পুলিশের যাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে, প্রয়োজনে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

অবশ্য আরাভের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়ে পিয়াসা ও রাজের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বনানীর একটি ফ্ল্যাটে জন্মদিনের দাওয়াতে গিয়ে খুন হন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তা মামুন ইমরান খান। গুম করতে লাশ গাড়িতে করে নেওয়া হয় গাজীপুরের কালীগঞ্জের একটি জঙ্গলে। সেখানে লাশে পেট্রল ঢেলে আগুনে ঝলসে দেওয়া হয় চেহারা।

তবে গত বৃহস্পতিবার ফেসবুক লাইভে এসে আরাভ হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২২ মিনিট ১৪ সেকেন্ড বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, কিছুদিন আগে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক ৫ কোটি টাকা চেয়েছিলেন। ওই টাকা না দেওয়ায় তিনি সংবাদ প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছিলেন। হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আরাভ বলেন, ‘আমার দোষ শুধু ওই অফিসটা ছিল আমার।’

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা মামুন হত্যাকান্ডের সঙ্গে আরাভ জড়িত। তিনি চার্জশিটভুক্ত আসামি। তার ফেসবুকে নিজেই স্বীকার করেছেন লাশ গুম করার সঙ্গে তিনি জড়িত। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’ তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১২টি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে জানান তিনি।

দুবাইয়ে অবস্থান করা এক ব্যবসায়ী টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, আরাভ জুয়েলার্সে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সোনা আছে। দোকানের লোগো বানাতেই খরচ হয়েছে ৪২ কোটি টাকা। ক্রিকেটার সাকিবকে নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো আরাভ লাইমলাইটে আসা। মাস ছয়েক আগে আরাভ দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট কেনেন। দুবাইয়ে তার নামে আরও সাতটি ফ্ল্যাট আছে।

ওই ব্যবসায়ী বলেন, আরাভকে দেখে বোঝা যাবে না যে অপরাধজগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। তার আচার-ব্যবহার কিন্তু খুবই ভালো। অল্প সময়ে সবাইকে আপন করে নেন। গুলশান ও বনানী এলাকার কিছু ব্যবসায়ী ও মডেল প্রায়ই আসেন আরাভের কাছে। তার জুয়েলারির ব্যবসায়িক অংশীদার দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ও দুই ব্যবসায়ী।

আরাভের কানাডা ও আমেরিকার নাগরিকত্ব আছে জানিয়ে ওই ব্যবসায়ী বলেন, সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর তাকে বাইরে খুব কমই দেখা যাচ্ছে। তার ঘনিষ্ঠরা বলাবলি করছেন, যেকোনো সময় তিনি কানাডা বা আমেরিকায় চলে যাবেন। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে হয়তো দুবাই আসবেন এমন ধারণা সেখানকার বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আরব আমিরাত সরকার তাকে রেসিডেন্ট পারমিট দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত