প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষিত শিল্পে

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ০২:১৫ এএম

বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদের শুরুতেই শিল্প খাতে গতি আনতে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্প-সম্পর্কিত ১০টি প্রতিশ্রুতি এবং ৬০টি নির্দেশ নিয়ে প্রথমবারই গ্রহণ করেছেন একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা। তিন মেয়াদ মিলিয়ে গড়ে প্রায় ১৪ বছর পার হলেও এ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির দুটি বাস্তবায়িত হয়েছে, আটটির কাজ চলছে। ৬০টি নির্দেশের মধ্যে ৩৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে, ২৫টির কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশ গত জানুয়ারি পর্যন্ত কতটা অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদন থেকে প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশ বাস্তবায়নের এ হিসাব পাওয়া গিয়েছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিল্প খাতে গতি আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক সময় সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ের অনেক নির্দেশও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মেয়াদেই ১০ প্রতিশ্রুতি এবং ৬০ নির্দেশ নিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসব কর্মপরিকল্পনা শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সরকারের প্রতি মেয়াদেই এসব কর্মপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১১ সালের ৫ মার্চ বন্ধ সরকারি ছয় কারখানা খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিলস লিমিটেড (কেএনএম), চিটাগাং কেমিক্যাল কমপেক্স লিমিটেড (সিসিসি), ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএলসিএল), বাংলাদেশ ইন্স্যুলেটর স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিআইএসএফ), নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস লি (এনবিপিএমএল), দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি লিমিটেড চালু করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কারখানা চালুর প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এ কর্তৃপক্ষ থেকে ওই কর্তৃপক্ষ, ফাইল চালাচালি চলছেই।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, কেএনএমের জমির পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৬১ একর। অতীতের দায়দেনা পরিশোধ করতে কেএনএমের ৫০ একর জমি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের (নওপাজেকো) কাছে ৫৮৬ দশমিক ৫২ কোটি টাকা মূল্যে বিক্রিতে চুক্তি হয়। নওপাজেকো কেএনএমকে ২৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা দিলেও বাকি আছে ৩৩২ দশমিক ১০ কোটি টাকা। কেএনএম থেকে পাওনা পরিশোধে অনুরোধ জানিয়ে নওপাজেকোকে ২৫ বার চিঠি পাঠিয়েছে। অথচ এখনো বাকি টাকা পরিশোধ করেনি। কেএনএমের ৩৭ দশমিক ৬১ একর জমি এবং খুলনা হার্ডবোর্ড মিলস লিমিটেডের ৯ দশমিক ৯৬ জায়গা এক করে ৪৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গায় আধুনিক কাগজ কল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রায় ১০ বছর পর ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর ওয়াসো ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গত ১১ ডিসেম্বর কাজ শুরু করেছে। সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ে নির্দেশে আধুনিক কাগজ কল নির্মাণের অগ্রগতি এটাই। 

২০১২ সালের ৩০ জুন টাঙ্গাইল শিল্পপার্ক, ২৫ ফেব্রুয়ারি বাইশদিয়া উপজেলায় জাহাজভাঙা শিল্প ও শিপইয়ার্ড এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সন্দীপ উপজেলায় বিসিক শিল্প নগরী নির্মাণে নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাহাজ নির্মাণশিল্প ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং একই বছরে ৯ এপ্রিল সিরাজগঞ্জে অর্থনৈতিক জোন ও শিল্প নগরী নির্মাণে বলা হয়েছে। ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর মুহুরী প্রজেক্টে জেগে ওঠা ১৭ হাজার একর জমিতে শিল্পপার্ক স্থাপনে এবং ২০১৮ সালের ২ মার্চ ঠাকুরগাঁওয়ে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনে নির্দেশ থাকলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে। ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে বিসিক থেকে শিল্প প্লট কিনে শিল্প নগরী স্থাপনে এবং একই বছরে ১১ মে মধুপুরে আনারসের জন্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনে নির্দেশ দিলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

২০০৯ সালের ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন।

নির্দেশে বলা হয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ও পুরনো প্রতিটি সরকারি কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি নির্মাণ করতে হবে। একইভাবে প্রতিটি বেসরকারি কারখানায়ও ইটিপি বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিল্পপার্কে কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। বেসরকারি কারখানার মালিকরা ইটিপি নির্মাণের ব্যয় বহন করতে সক্ষম না হলে প্রয়োজনে সরকারি তহবিল থেকে তাদের ইটিপি নির্মাণ করে দিতে হবে। পরে কারখানার মালিকদের কাছ থেকে নির্মাণব্যয় ও একটি ফি আদায় করতে হবে। ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও একই নির্দেশ দিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠান। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ অনুযায়ী এখনো সব সরকারি-বেসরকারি কারখানায় ইটিপি স্থাপনের বিষয় নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই শেখ হাসিনা সরকারি চিনিকলগুলো লাভজনক করতে জোর দেন।

প্রসঙ্গত, চিনিকলগুলো আখ স্বল্পতায় বছরের সাত থেকে আট মাস বন্ধ থাকে। চিনিকলগুলোর অনেক পুরনো যন্ত্রপাতিতে উৎপাদন সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে চিনি উৎপাদনের কাঁচামাল আখের পাশাপাশি সুগার বিট চাষ, র-চিনি আমদানি করে সরকারি চিনিকলে পরিশোধন করে চিনি উৎপাদন, চিনিকলের যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন এবং চিনিকলের অব্যবহৃত জায়গায় নতুন শিল্প নির্মাণে নির্দেশ দেন। চিনিকলের বয়লার ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, মোলাসেস থেকে ইথানল, বায়োগ্যাস এবং সার উৎপাদনেও নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারি ১৫ চিনিকলে পর্যায়ক্রমে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে প্রথম ধাপে নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের জন্য ৩২৫ কোটি টাকা এবং ঠাকুরগাঁও চিনিকলের জন্য ৪৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ করা অর্থে দুই চিনিকলের পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা, বিদ্যুৎ কো-জেনারেশ করার কথা আছে। র-চিনি আমদানি করে পরিশোধিত চিনি উৎপাদন, মোলাসেস থেকে ইথানল বানানো, বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়ারও কথা আছে। একই সঙ্গে সার বানানোর নির্দেশ আছে। এসব সার আখ এবং সুগার বিট উৎপাদনে ব্যবহার করার কথা। সুগার বিট ‘চিলার স্টোরেজ’ নির্মাণ করে সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এসব উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ পর্যন্ত সরকারের ৯ চিনিকল বন্ধ করা হয়েছে।  

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ দেশে অনেক ভালো উদ্যোগও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে বছরের পর বছর আটকে থাকে। প্রধানমন্ত্রী গতিশীল অর্থনীতি চান। এজন্য গতিশীল শিল্প খাত প্রয়োজন। অতীতে দেখেছি সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ের অনেক নির্দেশও এ দেশে এই হচ্ছে, এই হচ্ছে করে বছরের পর বছর পড়ে থাকে। এটা কিন্তু নতুন কিছু নয়। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর যে দুই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে তা হলো, বরগুনায় এবং রাজশাহীতে বিসিক শিল্প নগরী স্থাপন। জেলাপর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা নির্মাণের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে শিল্পনীতিতে সহায়ক সুযোগ রাখা, অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডে জনবল নিয়োগ, বিএসটিআইয়ের মানের উন্নয়ন, সময়মতো জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়নসহ ৩৫টি নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিল্প মন্ত্রণালয়ে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়নে চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি সবগুলো শেষ হয়ে যাবে। এতে শিল্প খাতে অবশ্যই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত