প্রযুক্তিতে পিছিয়ে আবহাওয়া দপ্তর

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ০২:৪০ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে প্রতিদিনের আবহাওয়া আর প্রকৃতিতে। আবহাওয়াবিদদের কাছেও রহস্যময় হয়ে উঠেছে ঝড়-বৃষ্টি বা বন্যার চরিত্র। পুরনো প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ভুল পূর্বাভাসও দিতে পারছেন না তারা। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরাও পাচ্ছেন না কৃষি জলবায়ুর ধারণা।

যদিও ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর আশা করা হচ্ছিল, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস আরও সহজ ও নির্ভুল হবে। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর পর এসেও নিজেদের স্যাটেলাইটের সুবিধা পাচ্ছে না আবহাওয়া অধিদপ্তর। উল্টো একাধিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ রাডার বিকল হয়ে আছে বছরের পর বছর।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৩ মার্চ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব আবহাওয়া দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য : ‘প্রজন্মান্তরে আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানির ভবিষ্যৎ’।

দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, আবহাওয়া ও জলবায়ু সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশে^ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যেখানে দিন দিন আধুনিক হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ পেছনের দিকে যাচ্ছে। সময়োপযোগী অর্থায়ন ও প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটালেই সঠিক তথ্য দিতে পারবে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়ার আগাম তথ্য না জানায় গত বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন আলুচাষিরা। হঠাৎ বৃষ্টির ফলে এ সময় সরিষা ও গমক্ষেতও ক্ষতির মুখে পড়ে। অতিবৃষ্টির আগাম খবর আবহাওয়া অধিদপ্তর দিতে না পারায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

একইভাবে গত বছর অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ধাক্কায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, মধ্য অঞ্চল ও দক্ষিণ উপকূলের মানুষ। এ ঘূর্ণিঝড়ের শুরু থেকেই গতিবিধি বুঝতে পারেনি আবহাওয়া অধিদপ্তর। ফলে শুরু থেকে সিত্রাংয়ের গতিপথ নিয়ে একেক সময় একেক তথ্য দিয়েছে তরা। সিত্রাংয়ের আঘাতে সে সময় প্রায় ৩৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, পুকুর ও কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভাষ্য ছিল, শুরু থেকেই ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এলোমেলো আচরণ করতে পারে। বারবার পাল্টাতে থাকে গতিপথও। তাই এর গতিবিধি ঠিকমতো বোঝা যায়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রযুক্তিগত ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. ছাদেকুল আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবহাওয়া অবজারভেশনের (পর্যবেক্ষণ) জন্যও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আবহাওয়ার সঠিক তথ্য পেতে হলে সুপার কম্পিউটার প্রয়োজন। কিন্তু এটা কিনতে গেলে ১ হাজার কোটি টাকার উপর খরচ পড়বে। শুধু তাই নয়, এর জন্য পাঁচ মেগাওয়াটের একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন। কিন্তু ইনভেস্ট (বিনিয়োগ) না করলে রেজাল্ট (ফল) পাব কোথা থেকে।’

নিজেদের স্যাটেলাইটের সুবিধা পাচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ একটি ‘কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট’। সেখান থেকে আমরা বিশেষ কোনো সুবিধা পাই না। আমাদের জন্য পে-লোডের ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেয়নি। ফলে আমরা পর্যবেক্ষণ নিতে পারি না। ডেটা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকি। আমাদের জন্য আলাদা করে পে-লোডের প্রয়োজন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ক্যামেরা থাকে আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য। কিন্তু সেসব নেই। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, এরপর যে স্যাটেলাইট পাঠানো হবে সেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।”

তিনি বলেন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য যে পাঁচটি রাডার আছে এগুলোও অনুদানে পাওয়া। আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ায় রাডারগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। এর মধ্যে দুটো রাডার অচল হয়ে আছে। যদিও এগুলো মেরামতের কাজ চলছে। ঢাকা এবং রংপুরেরটা পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে। বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হলে কোথায় বৃষ্টি নামবে বা কতটুকু বৃষ্টি হবে তা নির্ধারণ করা যায় রাডারের সাহায্যে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস দেয় তা বেশিরভাগ সময় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দায়সারা মনোভাবকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, অংশীজনদের সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের খুব একটা সমন্বয় নেই, থাকলেও কার্যকর নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাদেকুল আলম বলেন, ‘আবহওয়া অধিদপ্তরের কাজ হচ্ছে তথ্য সরবরাহ করা, মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া নয়। আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে পারে বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগ। আমরা যাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করে থাকি তার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এসব স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনরা যদি ঠিকভাবে কাজ করে তাহলে সাধারণ ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের চেয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর উন্নত হয়েছে। গত কয়েক বছর আবহাওয়া অধিদপ্তর নির্ভুল তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের উন্নত প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু নতুন নতুন যন্ত্র আনলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বিষয়টা এমন নয়। তার ব্যবহারও জানতে হবে। আমি মনে করি উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র কেনার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষিত জনশক্তি না হলে এসব যন্ত্র কিনে কোনো লাভ নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত