ভারত ছাড়ে গ্যাস, আটকায় পানি

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৩, ১১:৩৯ পিএম

পাশাপাশি দুই খবর। মৈত্রী পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি উদ্বোধন এবং দুদেশের অভিন্ন নদী তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গে দুটি খাল খননের পরিকল্পনা। যা প্রকারান্তরে ভারত প্রশ্নে আশা-দুরাশার দ্বৈরথ। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সংঘাত। বিষয়টা এমনও নয়, ভারত তিস্তায় তেষ্টা মেটানোর প্রতিদানে পাইপলাইনে গ্যাস দেবে। কিন্তু, কাছাকাছি সময়ে ঘটমান বর্তমান বলে কথা। কথার পিঠে আবার নানান কথা।

ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশে বরাবরই একটি মিথস্ক্রিয়া। ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতা। এর কারণ পুরোটাই ঐতিহাসিক। ভারত আমাদের অনেক দিয়েছে বলে প্রতিষ্ঠিত। আবার অনেক কিছু নিয়েছে তাও প্রমাণিত। এ বিতর্কের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথাচ্ছলে বলেছেন, ভারতকে যা দিয়েছি আজীবন মনে রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্য ছাড়াও নানা কারণে বাংলাদেশে ভারত বিষয়ক ক্রিয়া-বিক্রিয়া শেষ হওয়ার নয়। এর মাঝেই বন্ধুত্বের সেতুবন্ধ। এর মাঝেই মৈত্রী। পাইপলাইনে আন্তঃদেশীয় জ্বালানি সংযোগের অভিষেক। পাইপলাইনে আনা ডিজেলে কেবল উত্তরাঞ্চলের ষোল জেলার চাহিদা পূরণই হবে না খরচও আগের চেয়ে কমবে বলে আশা।

এমন এক সময়ে কাজটি হলো যখন গোটা বিশ্ব ধুঁকছে জ্বালানির জ্বালায়। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অনেক দেশের জ্বালানি সংকটে ভোগার সময়ে এ মৈত্রী পাইপলাইন আন্তর্জাতিক মানের খবর। আঞ্চলিক কূটনীতিও বটে। ভারত থেকে পাইপলাইনে প্রাথমিক অবস্থায় বছরে ২ লাখ টন জ্বালানি পাওয়া যাবে, পরে উন্নীত হবে ১০ লাখ টনে। পূর্ণক্ষমতায় গেলে পরিবহন ব্যয় বাবদ বছরে প্রায় শতকোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা। এ ধরনের পাইপলাইন ও তেল আমদানির বিষয়টিই বাংলাদেশের জন্য নতুন। এর বিস্তারিত জানাও সময় সাধ্য।

২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটির অনুমোদনের পর, এ বিষয়ে চুক্তি সই হয়। নথি অনুসারে, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে, পেট্রোলিয়ামের পুরো চালান উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামের গোলাঘাটে অবস্থিত নুমালিগড় শোধনাগার থেকে আসবে। আর, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর পেট্রোলিয়াম জ্বালানি ডিপোতে এই চালান গ্রহণ করবে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত পাইপলাইনের বেশিরভাগ বাংলাদেশের অংশে হলেও ভারত সরকার বাংলাদেশ অংশ নির্মাণের জন্য লাইন অফ ক্রেডিট-এলওসির অধীনে প্রায় ৩০৩ কোটি রুপি ঋণ দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার অংশে পাইপলাইন পরিচালনা করবে এবং ভারত তার অংশে পাইপলাইন পরিচালনা করবে। বাংলাদেশ প্রথম তিন বছরে বার্ষিক দুই লাখ ৫০ হাজার টন, চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ বছরে বার্ষিক তিন লাখ টন, সপ্তম থেকে দশম বছরে বার্ষিক সাড়ে তিন লাখ টন এবং ১১তম থেকে ১৫তম বছর পর্যন্ত বার্ষিক চার লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করবে।

মূলত ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড-এনআরএল থেকে ডিজেল আনার পরিমাণ বাড়ানোই এই পাইপলাইনটি নির্মাণের উদ্দেশ্য। নুমালিগড় রিফাইনারি ও বিপিসির অধীনস্ত কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত জ্বালানির পঁচাত্তর শতাংশই ডিজেল এবং দেশে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৬ লাখ টন। এর আশি ভাগই আমদানি করতে হয়। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রতি মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ের মাধ্যমে দুই হাজার দুশো টন ডিজেল আমদানি হয় বাংলাদেশে। এখন তা ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার পাইপলাইনে আনায় সমস্যা হয়ে যাবে। রেল ওয়াগনে অপচয় হয়, প্রায়ই নানা দুর্ঘটনায় ক্ষতি হচ্ছে। সেই বিবেচনায় পাইপলাইন ‘বেস্ট স্মার্ট’ উপায়।

এ বিষয়ক বেশি বিতর্ক শোভন নয়। এরপরও তা হচ্ছে। সংশয়ও কম নয়। এ পাইপলাইন বাংলাদেশকে জ্বালানি ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় ভারত নির্ভর করে তুলতে পারে বলে ছড়ানো-ছিটানো কানাঘুষার ফয়সালাও এখনই সম্ভব নয়। এতে গ্যারান্টেড সাপ্লাইয়ের বিষয়টি কেমন তা বুঝতেও সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে যখন তখন দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশকে বিপাকে ফেলে কিনা- এ সংশয় কাটাও সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি অবশ্য বলছে এতদিন যে পদ্ধতিতে ভারত থেকে ডিজেল আনা হচ্ছিল সেটি আদর্শ ছিল না, এখন একটা মানদণ্ডে আসবে। খরচ কমবে, যথাসময়ে জ্বালানি আসবে। সেই আশায় অপেক্ষা করাই আপাতত উত্তম। কিন্তু, তিস্তার পানির বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগমুক্ত থাকা যাচ্ছে না। তিস্তার পানি প্রত্যাহারে ভারতের নতুন করে খাল খনন বিষয়ে নোট ভারবাল দিয়ে জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ। রবিবার বিকালে সাংবাদিকদের তা নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে ভারতের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি জানতে চাওয়া হবে।

উজান থেকে পানি না আসায় এমনিতেই শুষ্ক মৌসুমে ধু ধু বালুচর জাগে তিস্তায়। মড়াকে মারার মতো এখন তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গে দুটি খাল খননের পরিকল্পনা ভারতের। এর মূল উদ্দেশ্য ভারতীয় অংশে সেচের সম্প্রসারণ করা। এই বাঁধ দিয়ে প্রথম পর্যায়েই প্রায় ১০ লাখ হেক্টর, অর্থাৎ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে জন্য ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল করা হয়েছে। এসব খাল একদিকে গেছে পশ্চিম-দক্ষিণে অগ্রসর পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলা পর্যন্ত। অন্যদিকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলা পর্যন্ত গেছে। এখন যে নতুন দুটি খাল খনন করা হচ্ছে, তা এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের বাস্তবায়নের অংশ।

ভারতের পানি উন্নয়ন পরিকল্পনায় গজলডোবা বাঁধের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরইমধ্যে এই বাঁধ তিস্তা থেকে পানি পশ্চিম দিকে নাগর-টাঙ্গন, ডাউক এবং মহানন্দা নদীতে এবং পূর্ব দিকে জলঢাকা নদীতে প্রবাহিত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। সে লক্ষ্যে মহানন্দা নদীর ওপর জলপাইগুড়ি জেলার ফুলবাড়ীতে এবং ডাউক নদীর ওপর উত্তর দিনাজপুরের চোপড়াতে দুটি পিকআপ ব্যারেজ নির্মিত হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্রহ্মপুত্র এবং তার বিভিন্ন উপনদী যেমন মানস, সংকোশ থেকে পানি ভারতের পশ্চিমে এবং দক্ষিণে প্রবাহিত হওয়ার জন্য এই বাঁধ ব্যবহৃত হবে। এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের অংশ হিসেবে মহানন্দা নদীর ওপর তিনটি খালের সংযোগস্থলে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে গজলডোবা বাঁধ বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকার জন্য একটি বড় হুমকি।

তিস্তার উজানে ভারতের আরও কয়েকটি বাঁধ আছে। ভবিষ্যতে এর উজানে এবং এর বিভিন্ন উপনদীর ওপর ভারতের আরও প্রায় ১৫টি বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের জন্য তিস্তার শুষ্ক মৌসুমের কোনো প্রবাহ অবশিষ্ট থাকবে না। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। অংশীদার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সম্মতি ভিন্ন এই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর এ ধরনের হস্তক্ষেপ ভারত করতে পারে না। কিন্তু করছে। করেই চলছে। তা আর কত? ভারত তিস্তার পানি প্রশ্নে এমনটি করতেই থাকলে ভরসা হতে পারে বাংলাদেশের ভাটিতে তিস্তায় চীনের সহায়তায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ দ্রুত বাস্তবায়ন। এর অনুমিত বাজেট প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা)। সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ক তথ্য দিতে বেশ কার্পণ্য। পারলে তথ্য লুকিয়েই রাখে। কিন্তু, চীনের পাওয়ার চায়না কোম্পানি ইউটিউবে ভিডিওর মাধ্যমে এই প্রকল্পকে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে চলছে। ভারতের টেলিগ্রাফও কিছু তথ্য দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন বলছে, আরও দুটি খাল খননের জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সেচ বিভাগ প্রায় এক হাজার একর পরিমাণ জমির মালিকানা পেয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন জমির মালিকানা হস্তান্তর করেছে। এতে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার এলাকার আরও অনেক কৃষিজমি সেচের আওতায় আসার মধ্য দিয়ে বড় রকমের উপকার পাবে ভারত, পানি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হবে বাংলাদেশ।

তিস্তা নিয়ে মূলত বাংলাদেশের নতুন করে ক্ষুব্ধ হওয়ার কিছু নেই। গত প্রায় পঁচিশ বছর ধরে নানা তদবির করেও শুষ্ক মৌসুমে আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার পানি ভাগাভাগির ফয়সালা পায়নি বাংলাদেশ। ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের গড়িমসি ও হেঁয়ালিতে পরাজিত হয়েছে সব দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টা ও আয়োজন। তাই সব বাদ দিয়ে এখন আশাবাদ চীন বা যে কারও সহযোগিতায় তিস্তার পুনরুজ্জীবন দেওয়া। চীনা প্রকল্পে গলা দিয়ে আর্থিক সংকটের বেড়াজালে পড়ে এবং চীনের সঙ্গে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ক্রসফায়ারে পড়ার ঝুঁকিও কম নয়। তাই নিজ উদ্যোগে কিছু করার তাগিদ রয়েছে কারও কারও। তারা বলতে চান, নিজ প্রচেষ্টায় পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্পের সক্ষমতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে তিস্তা ছাড়াও বাংলাদেশ  অংশের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, টিপাইমুখ ইত্যাদিকে ঘিরে ছোট ছোট প্রকল্প নেওয়াও বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত