মানবাধিকারকর্মী ও ফৌজদারি মামলা পরিচালনা করেন এমন আইনজীবীরা প্রায়ই বলেন, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের আগে কিংবা পরে ‘জামাই আদরে’ রাখা হলেও উল্টো চিত্র দেখা যায় অন্য মামলার আসামিদের বেলায়। ডান্ডাবেড়ি, হাতকড়া ও কোমরে দড়ি বাঁধার মতো ঘটনার ভুক্তভোগীও তারা।
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণের ঘটনায় করা একটি মামলায় সীমা গ্রুপের পরিচালক পারভেজ উদ্দিন সান্টুকে গ্রেপ্তারের পর কোমরে দড়ি বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে নেওয়া হয় আদালতে। গত ১৫ মার্চের এ ঘটনার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় ওঠে। বিশেষ কারণ ছাড়াই সংবিধান, উচ্চ আদালত ও আইনের তোয়াক্কা না করে কোমরে দড়ি, ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরানো নিয়ে আবার প্রশ্ন ওঠে।
শুধু সান্টুই নন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। গ্রেপ্তারের আগে-পরে অতি উৎসাহী কতিপয় পুলিশ সদস্য এমন কাজটি করেন। যখন-তখন যাকে-তাকে হাতকড়া, কোমরে দড়ি আর অপ্রয়োজনে ডান্ডাবেড়ি পরানোর কারণে পুলিশ বিভাগ প্রায়ই বিব্রত হয়। গত তিন মাসে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়াই ডান্ডাবেড়ি, হাতকড়া ও কোমরে দড়ি পরানোর অন্তত চারটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে শরীয়তপুর ও গাজীপুরে দুটি ঘটনায় ফৌজদারি মামলার দুই আসামিকে ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে মায়ের জানাজায় হাজির করার ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়। যদিও বাস্তবে এমন ঘটনা অনেক বেশি, কিন্তু আলোচনায় আসে না। অনেকে প্রতিবাদও করেন না। গ্রেপ্তার বা আটকের আগে-পরে নির্যাতন ও খারাপ আচরণের অভিযোগও পুরনো।
তবে পুুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সীতাকুন্ডের ওই ব্যবসায়ীর কোমরে দড়ি বাঁধার ঘটনার পরদিন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বিশেষ বার্তা পাঠিয়ে নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ নিয়মের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করছে। যদি কেউ তা অমান্য করে তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। কেননা নিয়ম ও আইনের বাইরে কেউ নন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর কোমরে দড়ি বাঁধার পর আমরা আসলেই লজ্জিত। তিনি তো কোনো দাগি অপরাধী ছিলেন না। মাঝেমধ্যে জঙ্গি বা দুর্ধর্ষ অপরাধীদের হাতকড়া, কোমরে দড়ি বাঁধা ও ডান্ডাবেড়ি পরানোতে শিথিলতা ছিল। যে কারণে কয়েক মাস আগে আদালতপাড়া থেকে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। অপরাধী বা মামলার আসামি গ্রেপ্তার বা আটকের পর অতিউৎসাহী হয়ে খারাপ আচরণ করা যাবে না এমন বার্তা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। যাকে-তাকে দড়িবাঁধা বা হাতকড়া পরানো যাবে না। ব্যত্যয় ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী, আটক কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে নাগরিকের সম্মান রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উঁচুমানের পেশাদারিত্ব দেখাতে হবে। বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশনের (পিআরবি) প্রবিধান ৩৩০-এ হাতকড়া সংক্রান্ত বিধানে শুধু সহিংস ও কুখ্যাত অপরাধী, উচ্ছৃঙ্খল আসামি ও পলায়ন রোধ করতে, আসামির আনা-নেওয়ার রাস্তা দীর্ঘ হলে যতটুকু প্রয়োজন সে বিবেচনায় হাতকড়া পরানোর কথা বলা আছে। কোনো ক্ষেত্রে হাতকড়া না থাকলে দড়ি বা কাপড় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবীরা বলেন, এ প্রবিধানে কোথাও কোমরে দড়ি বা ডান্ডাবেড়ি ব্যবহারের কথা বলা নেই। অন্যদিকে কারাবিধি (জেলকোড) এবং কারা আইনে (প্রিজনস অ্যাক্ট) কারাগারের অভ্যন্তরে অপরাধ কিংবা উচ্ছৃঙ্খল আসামির ক্ষেত্রে, ষড়যন্ত্র করলে এবং পালানোর চেষ্টা করলে অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে হাতকড়া এবং ডান্ডাবেড়ি ব্যবহারের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ফৌজদারি বিধান ও ওই প্রবিধান অনুযায়ী, যদি আসামি বৃদ্ধ, রোগী, অক্ষম, দুর্বল, শিশু বা নারী হয় তাহলে হাতকড়া লাগানো যাবে না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্যাতন করা যাবে না।
অন্যদিকে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যেমন নিষিদ্ধ তেমনি ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের অভিযোগ, এত কিছুর পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন।
কোমরে দড়ি, ডান্ডাবেড়ি এবং হাতকড়ার অপব্যবহার রোধে নির্দেশনা চেয়ে রিটের পর গত ৩০ জানুয়ারি এ বিষয়ে একটি নীতিমালার প্রশ্নে রুল দেয় হাইকোর্ট। এটি বিচারাধীন রয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি পুলিশ যেভাবে ডান্ডাবেড়ি, কোমরে দড়ি বেঁধে উপস্থাপন করছে তাতে এটি মানুষের মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ বিচার ও অপরাধ প্রমাণের আগেই নাগরিককে লজ্জাকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে যা অনাকাক্সিক্ষত এবং প্রচলিত সংবিধান, উচ্চ আদালত ও আইনকে অবজ্ঞার শামিল।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্য হচ্ছে দেশে আইন সবার জন্য সমানভাবে যেমন প্রযোজ্য হয় না তেমনি পুলিশ সাধারণ নাগরিকের মর্যাদা ও সম্মানরক্ষার ব্যাপারে মোটেই সচেতন না। এ থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় তা নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারকে চিন্তা করতে হবে।’
সীতাকু-ে সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টের পারভেজকে গ্রেপ্তার এবং তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদে সোচ্চার হন। ওই ছবি প্রকাশ হওয়ার পর সীতাকুন্ড প্রেস ক্লাবের সভাপতি সৌমিত্র চক্রবর্তী তার ফেসবুক আইডিতে ছবিটি শেয়ার করে লেখেন, ‘প্রতিবাদ জানানোর ভাষা নেই! অশনিসংকেত!... অপরাধ কী? তার কারখানায় বিস্ফোরণ হয়েছে। বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনা কি আর কোথাও হয় না? প্রতিদিন মহাসড়কে দুর্ঘটনা হয় না? উনি তো চুরি করেননি। কোনো খুনও করেননি।’
ঘটনার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ সীতাকু-ের সব অক্সিজেন কারখানা বন্ধ রাখা হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর অক্সিজেন কারখানা বন্ধের ঘোষণা থেকে সরে আসে জাহাজভাঙা শিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)।
ব্যাপক সমালোচনার পর ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সোলায়মান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অরুণ কান্তি বিশ্বাস নামে এক উপপরিদর্শক নিজের ইচ্ছাতে তার (পারভেজ) কোমরে দড়ি ও হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়েছিলেন। এরই মধ্যে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর দেব আমরা।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে আইন ও অন্যান্য বিধিতে কিছু সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু কোথাও অভিযোগের নামে কোনো নাগরিককে অসম্মান ও শারীরিক মানসিক নির্যাতনের বিন্দুমাত্র বলা নেই। আর সব আসামির ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা পুলিশের সমান তৎপরতা দেখি না। তাহলে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে?’
