রাজনীতিতে অসহিষ্ণুতা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৩, ১১:৫৭ পিএম

 দেশের রাজনীতির অঙ্গনে বড় দলগুলো পরস্পরকে অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরের আনুষ্ঠানিক দেখা-দেখি পর্যন্ত বন্ধ। রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে এক দলের নেতা, অন্য দলের অফিসে যাবে-বড় দলগুলো এটাকে পর্যন্ত দলীয়করণ করেছে। তৃণমূল পর্যায়ে, সমাজের অনেক ক্ষেত্রে এসব দলের বিভাজনে স্পষ্ট ভাগাভাগি হয়ে গেছে। অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে তার ছাপ মেলে। ঘায়েল করার জন্য দোষারোপকে সামনে আনছে প্রতিনিয়ত। ব্যক্তিগত পর্যায়েও দোষারোপ পৌঁছাচ্ছে। অধিকাংশ প্রচার মাধ্যম এটাকেই প্রধান করে তুলেছে। রাজনীতি মানে যেন, এ ধরনের দোষারোপ-এটি মনে করছে অনেকে।

এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ বিষয়ে অন্য সময় আলাপ করা যাবে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কী এমন ছিল? ব্রিটিশদের হাত থেকে এই দেশকে মুক্ত করতে নানা মাত্রায় লড়াই সংগঠিত হয়েছিল। ঐ সময় রাজনৈতিক দল কগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ঐ সময়ে প্রকাশ্য প্রধান দল কংগ্রেস-মুসলিম লীগের মধ্যে সম্পর্ক, বাক্য বিনিময় ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়। কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য প্রকাশ্যে কম এলেও নানা মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব ক্ষেত্রে অশালীন ভাষার পরিবর্তে যার যার অবস্থান থেকে যুক্তিতর্কই সামনে এসেছে। দেখা সাক্ষাতে পারস্পরিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত খোঁজখবর অনেক সংকট মোকাবিলায়, ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রেখেছে।

একথা বলে নেওয়া ভালো যে, একজন রাজনীতির ছাত্র হিসেবে জানি, রাজনীতি অর্থনীতির ঘনীভূত রূপ। একটা রাজনৈতিক দল শ্রেণি স্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়। কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় এসব দল গঠিত হয়েছে। এ বিষয়ে এখন আলোচনা নয়। কথা বলছি রাজনৈতিক সামাজিকতা, সংস্কৃতি নিয়ে।

পাকিস্তান আমলে বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ ও এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ মেলে। গোপনে দেখা সাক্ষাৎ, পারস্পরিক সহায়তা, অনেক রাজনৈতিক সংকট দূর করতে সহযোগিতা করেছে।

পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার দীর্ঘ লড়াইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী অপশক্তি, মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে এরা চিহ্নিত শত্রুপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের ঘৃণ্য অপকর্ম রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সহনশীল মাত্রাকে বৈরী পরিবেশে তৈরি করে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর স্বাধীন দেশেও আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতির পরিবেশে রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্য কথোপকথনের বাইরে পারস্পরিক সম্পর্কের খবর, নানাভাবে খবরাখবর নেওয়া সহায়তা করার কথা-বার্তা জানা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এমন উদারতার খবর পাওয়া যায় যা রাজনৈতিক বৈরী আদর্শের সঙ্গে মাননসই পর্যন্ত ছিল না।

রাজনীতির নানা উত্থান-পতনে, নানা সময়ে পরিবেশ একরকম না থাকলেও এসব ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক অবস্থান প্রাধান্য পায়। আজ এই অবস্থায় ভিন্ন মাত্রা চোখে পড়ছে।

টেলিভিশন টকশো, গুটিকয়েক সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়া রাজনীতিকদের একত্রিত হওয়ার জায়গা কম। বড় বিষয় হলো, এসব ক্ষেত্রে রাজনীতিক বা রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ প্রধান হলে দলীয়, গোষ্ঠী স্বার্থ বিবেচনায় পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে যায়। সৌহার্দ্য চলে যায় অন্তরালে। পক্ষ-বিপক্ষে চিহ্নিত করায়ও প্রবণতা এই দূরত্ব বাড়িয়ে তুলছে।

স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিক্রম করছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করলেও দেশের অধিকাংশ মানুষের মুক্তি অর্জিত হয়নি। এটি না হওয়া পর্যন্ত মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, আন্দোলন চলবে। বিশেষ করে কমিউনিস্ট, বামপন্থিরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশকে অগ্রসর করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার, মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখছে, রাখবে।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা অনেকে করেছিলেন সেটি অর্জিত হয়নি। সংকট ছিল। শ্রেণিস্বার্থের পরিচালিত দলগুলো তার স্বার্থরক্ষায় এগুবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে সংঘাত, সংঘর্ষ অনিবার্য। ঘটছেও তাই।

বহুদলীয় গণতন্ত্রে দেশ পরিচালনার কথা বলে এক ধরনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করে এগুনোর চেষ্টা করলেও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণিস্বার্থে ক্ষমতার ব্যবহার একচ্ছত্র ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ একে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই পরিবেশের অবসান হয়নি। বরং বেড়েছে।

ক্ষমতাশ্রয়ী দলগুলোর যার যার অবস্থানে যতটুকু তাদের বিবেচনায় আদর্শচর্চার মধ্যে ছিল, মানুষের স্বার্থরক্ষায় কিছুটা প্রাধান্য দিত তার থেকে পিছিয়েছে। বিপরীতে ক্ষমতার রাজনীতি বেড়েছে। এই ক্ষমতাই যেন সব। সব ক্ষমতা এক এক জায়গায় এক এক ব্যক্তি, গোষ্ঠীকে নতুন জমিদারে পরিণত করেছে। এর ফলে এসব ক্ষেত্রে সংস্কৃতিতে গোষ্ঠী বিভেদ, ব্যক্তি বিভেদ পরিচালিত হচ্ছে দলগুলোকে ঘিরে। দলগুলোকে ব্যবহার করাও হচ্ছে এখানে।

তাইতো নানা সময়ে এসব দলের মাঝারি সারির অনেককে বলতে শুনি, ‘কী করব আমরা তো... এমডি’র অধীনে আছি।’

৯০ দশকে এরশাদ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে সংকট নিরসনে পথযাত্রার এক পথ দেখিয়েছিল।

দীর্ঘ আন্দোলন, জীবনদানের অভিজ্ঞতায় তিন জোটের রূপরেখা ও আচরণবিধি প্রণীত হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কথা হলো :

‘অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। দক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’ ‘অসাংবিধানেক বা সংবিধান বহির্ভূত কোনো পন্থায়, কোনো অজুহাতে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না।’

সেই সঙ্গে বলা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দমন, সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রপাগান্ডা বন্ধ এবং এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম পরিচালনা। বলা হয়েছিল রাজনৈতিক সংকট হলে পারস্পরিক কথা বলে সমস্যা সমাধানের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা।

আদর্শকে প্রধান না করে ক্ষমতাশ্রয়ী বড় দলগুলোর কাছে এসব থেকে গেছে কথার কথা হিসেবে। এরপরও রাজনীতিতে নানা ঘটনা, এমনকি রাজনৈতিক দলের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। যার যার সুবিধামতো ইতিহাস রচনা চলছে। এসব ঘটনা আর রাজনীতি ব্যক্তি, গোষ্ঠীর লাভলাভে পরিণত হওয়ার জন্য ‘ক্ষমতা’ নামক সোনার হরিণকে একমাত্র মাধ্যম হিসেবে নেওয়া সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।

স্বাধীনতা দিবসের এই ক্ষণে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে দেশ-দেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে জনগণের শক্তিকে জাগ্রত করেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত