থিয়েটারে নারীর প্রতিভার ক্ষমতাশীল পদার্পণ

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৩, ১০:১৮ পিএম

বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চা ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে সাফল্যের সঙ্গে চলছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা নিয়মিত হতে শুরু করে। শুরু থেকে বাংলাদেশের থিয়েটারে নারীর অংশগ্রহণ সক্রিয়ভাবেই আছে। বলতে দ্বিধা নেই যে বাংলাদেশের থিয়েটারের সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নারী ও পুরুষ প্রায় সমানভাবেই পালন করছে।

শুরু থেকেই অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতোই থিয়েটার অঙ্গনেও ক্ষমতার অধিকারী পুরুষরাই। অর্থাৎ মূল সিদ্ধান্তের হোতা আসলে পুরুষরাই। বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাংগঠনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যদি দৃষ্টিপাত করা হয় তবে দেখা যাবে তাতে নারীদের তেমন কোনো নেতৃত্বের নজির নেই। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের প্রতিষ্ঠা ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্বর। এই ৫০ বছরে সারা যাকের একবার চেয়ারম্যান ছিলেন।

রোকেয়া রফিক বেবী অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। আর কোনো নারীর অবস্থান প্রায় নেই বললেই চলে! এমনকি বেশিরভাগ থিয়েটারের দলে দলপ্রধান হিসেবে এখনো কেন যেন পুরুষের আধিপত্যই চোখে পড়ে! তবে কি সামন্তীয় পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীবাদ ছেয়ে রেখেছে থিয়েটার অঙ্গনকে? জানা কথা যে প্রতিষ্ঠানের বিকাশের অন্তরায় এই পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীবাদ। প্রশ্নহীন কর্র্তৃত্বের দীর্ঘস্থায়িত্বের ফলে সদস্যদের বিকাশের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবের ফলে থিয়েটারে নারীর অংশগ্রহণ যেন অতি ব্রাত্য! আর কর্র্তৃত্ব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশীদারত্ব যেন গণ্যই করা হয় না! ক্ষমতাধর পুরুষতন্ত্রের কাছে ক্ষমতাহীন পুরুষ নিজেও যেন এক গৌণ চরিত্র! প্রধান চরিত্র ওই প্রাতিষ্ঠানিক পুরুষতন্ত্রের কাছে যখন ক্ষমতাহীন ও দুর্বল পুরুষ যেখানে নিজেই নিরুপায়, সেখানে নারীর স্থান যেন আরও নিচে!

এত কিছুর পরেও সুখের কথা হলো বাংলাদেশের বর্তমান থিয়েটার চর্চায় লক্ষ করলে করলে দেখা যায় যে, নাটকের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীর প্রতিভার ক্ষমতাশীল পদার্পণ রয়েছে। পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে অভিনয়, কোরিওগ্রাফি, নাট্য রচনা, পোশাক পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নারীরা যথেষ্ট এগিয়ে। বাংলাদেশে যতগুলো একক অভিনয় এখনো নিয়মিত মঞ্চস্থ হয় তার প্রায় সবগুলো নারী অভিনীত। এই একক নাটকগুলোর বিষয় নির্বাচন লক্ষ করলে দেখা যাবে তাতে উঠে এসেছে নারীর জীবনের নানা সংগ্রাম ও না বলা কথা।

ইতিহাস নারীদের উপেক্ষার কথা, সমাজ, পরিবার, প্রতিষ্ঠান থেকে বঞ্চনার কথাই বলছে। উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলোÑ কোকিলারা, বিনোদিনী, সীতার অগ্নিপরীক্ষা, গহনযাত্রা, পঞ্চনারীর আখ্যান, নভেরা, কহে বীরাঙ্গনা, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, পুতুলটিকে দেখে রেখো, শোণিতের হাত, হেলেন কেলার প্রভৃতি।

সত্যিকার অর্থে থিয়েটার দ্বারে প্রবেশ করার আগেই পরিবারের দ্বার থেকে প্রায় বহিষ্কৃত হয়ে যান নারীরা। কেননা জননী জায়া জ্ঞাত এই সমাজের দৃষ্টিতে ঘরোয়া জীবনে কেউ অশ্রদ্ধার, হিংসার, অবজ্ঞার পাত্রী নয়, কিন্তু এই নাটক করতে আসা নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টি যেন বেশি জটিল কুটিল আর ঘৃণার।

সময় বদলেছে, অনেক প্রগতিশীল পরিবার তাদের কন্যাসন্তানটির নাটকের মানুষ হওয়ার স্বপ্নপূরণে পাশে দাঁড়ান। কিন্তু তা অনেক ক্ষেত্রেই বিয়ের আগ পর্যন্তই থাকে। বিয়ের পরে নারীরা শুধু সংসার দেখবে! আর যদি কর্মজীবী নারী হয় তবে শুধু চাকরি আর সংসার দেখবে এর বেশি কিছু নয়!

একটু ভালো করে যদি বাংলাদেশের থিয়েটারের দলগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখব থিয়েটারগুলোতে সামন্তীয় নানান লক্ষণ এখনো ক্ষতের মতন রয়ে গিয়েছে। এখনো পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠী প্রাধান্যর মতো গুরুতর সমস্যাগুলোই দলগুলোর বিকাশে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বামী হয়তো দলপ্রধান ও স্ত্রী দলের অভিনেত্রী। এসব কি এই সমাজব্যবস্থার কারণে হয়েছে কিনা তা নিয়ে একটা সামাজিক গবেষণা হতে পারে। পারিবারিক বন্ধনকেন্দ্রিক থিয়েটারের এই রূপের সুবিধা আছে, অসুবিধাও আছে। সুবিধা হলো মহড়ার শিডিউল সমস্যা নেই, পারিবারিক দিক দিয়ে বাধা আসে না আবার সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত।

অসুবিধা হলো যে, সব নারীর পিতা-ভ্রাতা-স্বামী বা কাছের কেউই থিয়েটারের সদস্য না তাদের জন্য। ক্ষমতার কেন্দ্র এবং নির্দেশক যেহেতু পৌনঃপুনিকভাবে পুরুষ, ফলে ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেবল পুরুষতন্ত্রের চর্চাই হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে ক্ষমতাশীল পুরুষের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্কহীন নারীরা স্বাধীনভাবে প্রতিভা বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ হারান। উপরন্তু তার জন্য থাকে পারিবারিক লড়াই, অর্থনৈতিক লড়াই, সামাজিক নিরাপত্তার লড়াই ও শিল্পীর নিজের অস্তিত্বের লড়াই। আর এত কিছুর পরে থিয়েটার থেকে তাদের স্বীকৃতি প্রদানেও যেন যথেষ্ট কার্পণ্য দেখা যায়। এ যেন নানা রূপে নারীকে তার কাজ করার ক্ষেত্রে সেই প্রবাদটিই সত্যি হয়ে দাঁড়ায়!

We must think like a man act like a lady look like a young girl and work like a horse.

ঠিক এভাবেই যেন নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে নারীরা থিয়েটার শিল্পতে।

লেখক : নাট্যকর্মী ও শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত