আধুনিক অফিস ভবন বানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। দুদকের খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল এবং সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের নতুন ভবন ও ময়মনসিংহ কার্যালয়ের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করতে ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে পুরো অর্থায়ন করবে সরকার।
দুদক বলছে, অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কমিশনের আলামত, নথিপত্রের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা জোরদারকরণই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। প্রকল্পটির প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ময়মনসিংহ ছাড়া বাকি বিভাগগুলোতে ছয়তলা ভবন ও ময়মনসিংহে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে ব্যয় হবে ১২০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। একটি মোটরযান কিনতে খরচ হবে ৬৫ লাখ টাকা। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় হবে পাঁচ লাখ, ভবনগুলোর জন্য আসবাবপত্রের ব্যয় হবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ও দশমিক ৫ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে ৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
অবশ্য পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রতি বর্গফুটে ব্যয় সাত হাজার টাকার অনেক বেশি। বাস্তবায়নকারী সংস্থা দুদককে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ভবন নির্মাণের জন্য সিলেটে ৩০ মিটার, বরিশালে ৩৬ ও খুলনায় ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্যরে পাইল ধরা হয়েছে। এর ফলে এসব ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশনে অতিরিক্ত আরও দুই কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর আগে মাটি পরীক্ষা করে এ সমীক্ষা করা হয়েছে কি না তার ব্যাখ্যা দুদকের কাছে চাওয়া হয়েছে।
তা ছাড়া, ভবন নির্মাণের ব্যয়ের মধ্যে ভূমিকম্প প্রতিরোধের জন্য ময়মনসিংহে ১০ লাখ ৫৬ হাজার, সিলেটে ৩১ লাখ ২৫ হাজার, রাজশাহীতে ২৬ লাখ ২৬ হাজার ও রংপুরে ৩১ লাখ ২১ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এটিকে অতিরিক্ত দাবি করে পরিকল্পনা কমিশনের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে দুদকের কাছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দুদকের কাজের ধরন, আলামত ও নথিপত্রের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার স্বার্থে আধুনিক অফিস ভবন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দুদকের অধিকাংশ বিভাগীয় এবং জেলা কার্যালয়ের নিজস্ব অফিস ভবন নেই। সম্প্রতি যশোর, কুষ্টিয়া, রাঙ্গামাটি, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী ও হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরের বিভাগীয় কার্যালয়গুলো ও অধিকাংশ জেলা কার্যালয়ের কার্যক্রম ভাড়া করা বাড়িতে পরিচালনা করা হচ্ছে। ভাড়া করা অফিসগুলোর জন্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে কিন্তু ওই ভাড়া করা অফিসে উন্নত কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের অফিসগুলোর জন্য নিজস্ব ভবন প্রয়োজন।
সংস্থাটি মনে করে, দুদক কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ভবনে উন্নতকাজের পরিবেশ দিতে পারলে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে গতি আসবে। তাই দুদকের অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর যৌথ বাস্তবায়নকারী হিসেবে খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, বরিশাল এবং সিলেটে বিভাগীয় কার্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ এবং ময়মনসিংহে নতুন নির্মিত অফিস ভবনের ওপর দোতলা ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমনে নানামুখী সীমাবদ্ধতা কমাতে চায় দুদক। এ নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। অর্থ পাচার প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এ ছাড়া নিজেদের কার্যক্রম তুলে ধরে গত ২০ মার্চ রাতে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করেছে কমিশন।
দুদক সূত্র জানায়, নিজেদের সীমাবদ্ধতা কমাতে দুদক রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে যেসব পদক্ষেপ ও সুপারিশের কথা বলেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অর্থ পাচারের বিষয়টি। এ নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রো-অ্যাকটিভ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) এবং এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো, বিদেশি এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়, বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আনা-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ইউনিট গঠন ও জনবল নিয়োগের লক্ষ্যে বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো পর্যালোচনা করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে থাকে এমন দেশগুলোর দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাসমূহের সঙ্গে তথ্য, ইন্টেলিজেন্স, সাক্ষ্য-প্রমাণ আদান-প্রদান, সম্পদ ফ্রিজ, ক্রোক, বাজেয়াপ্তকরণ ও পুনরুদ্ধার কার্যকর করার জন্য দ্বিপক্ষীয় আইনি সহযোগিতা চুক্তি (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স ট্রিটি) করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
