বিশ্ব র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই আছে তলানি অঞ্চলে। ১৯২তম স্থানে থাকাটা মোটেই সম্মানজনক নয়। এ থেকে উত্তরণের পথ একটাই র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলে জয়ের চেষ্টা করা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন অবশ্য সে পথে হাঁটতে নারাজ। তাদের দরকার সস্তা সাফল্য। তাই তো তারা দুটি প্রীতি ম্যাচের জন্য বেছে নেয় অখ্যাত সিশেলসকে। ১৯৯ র্যাংকড দলটির নব্বইভাগ ফুটবলার অপেশাদার। অন্য পেশার ফাঁকে শখের বসে ফুটবল খেলা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া সেই সিশেলসও যখন বাংলাদেশকে হারিয়ে উদ্দাম আনন্দে মেতে ওঠে, তখন এ দেশের ফুটবল ও ফুটবলারদের দৈন্যই ফুটে ওঠে। দুই ম্যাচের সিরিজের প্রথমটি বাংলাদেশ জিতলেও পরেরটিতে ডুবতে হয়েছে হারের লজ্জায়। ফিফা টায়ার-১ ম্যাচ বলে এই হার নিশ্চিত প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশের র্যাংকিংয়ে। রেটিং পয়েন্ট তো কমবেই। অবস্থানেও ঘটতে পারে অবনতি। অথচ এই বছরটা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের। জুনে হবে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। এমন গুরুত্বপূর্ণ বছরের শুরুতে সিশেলসের মতো ‘অ্যামেচার’ দলের সঙ্গে খেলে কী পেল বাংলাদেশ? এমন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আসলে দীর্ঘদিন র্যাংকিংয়ের তলানিতে থাকার কারণে এখন আর বড় কোনো প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে আগ্রহ দেখায় না। অগত্যা...।
সিশেলসের বিপক্ষে এই সিরিজের জন্য অবশ্য প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল না। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে দল পাঠানো হয়েছিল সৌদি আরবে। মদিনায় দশদিন আবাসিক ক্যাম্পের পাশাপাশি দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ। দেশে ফিরে সিলেটে আরও সাতদিনের প্রস্তুতি। তবে মাঠে মেলেনি এমন প্রস্তুতির ছাপ। দুই ম্যাচেই বড্ড অগোছালো হাভিয়ের কাবরেরার দল। বরং মাঝিমাল্লার দেশ সিশেলসের অপেশাদার ফুটবলাররা বাংলাদেশের সঙ্গে খেলেছে সেয়ানে সেয়ানে। তারপরও বাংলাদেশ দলের স্প্যানিশ কোচ কাবরেরা ‘দল রয়েছে সঠিক পথে’ এমন আত্মতৃপ্তি করে হাসির পাত্র হয়ে যান নিমেষে। মঙ্গলবার সিলেটে হারার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোচ, জাতীয় দল ও বাফুফেকে ধুয়ে দিতে দেখা গেছে হাজারো ভক্তকে।
‘ওভার রেটেড’ ফুটবলারদের মান নিয়েও প্রশ্ন ভক্তদের। ক্লাব থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পকেটে পুড়ে ফুটবলাররা মাঠে প্রসব করে চলছে অশ্ব ডিম্ব। তাদের খেলায় নেই ধার, নেই মানসিকতায় দৃঢ়তা। তাই সিশেলসও তাদের কাছে কঠিন প্রতিপক্ষ। বাফুফে জেলা ফুটবলকে চাঙ্গা করতে কোনো পদক্ষেপ নেয় না বলে মানসম্পন্ন ফুটবলারদের সংকট চরমে পৌঁছেছে। ৩০ থেকে ৩৫ জন ফুটবলার ঘুরে ফিরে জাতীয় দলে জায়গা পাচ্ছেন সহজেই। টিকে থাকার প্রতিযোগিতা নেই, জায়গা ধরে রাখার চেষ্টাটাই তাই উধাও।
আর এই মানহীন ফুটবলারদের কোচ হয়েছেন এমন একজন, যার অতীতে বড় কোনো ক্লাবের হয়েও কোচিং করানোর খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই। অথচ বাফুফে মজে আছে সেই কাবরেরায়। সেই কোচ একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে দলটাকে একেবারের ঢোঁড়া সাপে রূপ দিয়ে ফেলছেন। দলে বিশ্বনাথ ঘোষের মতো পরীক্ষিত রাইটব্যাক থাকা সত্যেও কাবরেরা দুই ম্যাচেই খেলিয়েছেন সাদ উদ্দিনকে। যেই সাদ ২০২১ সালে ডিফেন্সে তালগোল পাকিয়ে সাফ ও চারজাতি আসরে কাঁদিয়েছিলেন জাতিকে। ২০২১ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে নেপালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি উপহার দিয়ে বাংলাদেশের ফাইনালের স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছিলেন। এর দুই মাস পর কলম্বোতে চারজাতি আসরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে বক্সের ভেতরে হ্যান্ডবল করে স্বাগতিকদের তুলে দেন ফাইনালে। এমন সব ভুলের পরও শিক্ষা হয়নি সাদের। মঙ্গলবার বক্সের ভেতরে সিশেলসের এক খেলোয়াড়ের মাথায় অবিশ্বাস্য লাথি বসিয়ে সর্বনাশ (পেনাল্টি) ডেকে আনেন। তা থেকে পাওয়া গোলটা ধরে রেখে বাংলাদেশকে হারের লজ্জায় ডোবায় আফ্রিকান দলটি। আর নামধারী ফরোয়ার্ডরা এই সিরিজেও পাননি লক্ষ্যের দেখা। সুমন রেজা, মতিন মিয়া, আমিনুর রহমান সজিব, রাকিব হোসেনদের সঙ্গে আক্রমণভাগে যোগ দিয়ে এলিটা কিংসলেও যেন গোল করতে ভুলে গেছেন! নাগরিকত্ব বদলে কিংসলে অভিষেকের দুই ম্যাচেই খেলেছেন বদলি হিসেবে এবং দু ম্যাচেই গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করেছেন একাধিক। ফরোয়ার্ডদের ব্যর্থতার মিছিলে একমাত্র গোলটা তালেগোলে করেছেন স্টপারব্যাক তারেক কাজী!
বাফুফের উদাসীনতায় বাংলাদেশ এখন অনামি কোচ ও দলগুলোর নাম কুড়ানো আর বায়োডাটা ভারী করার মঞ্চ। মাত্রই কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা অনামি কোচদের ধরে এনে দেওয়া হয় জাতীয় দলের দায়িত্ব। আর দলকে খেলানোর জন্য বাফুফের কর্তারা খুঁজে পেতে বের করেন মঙ্গোলিয়া, সিলেশসের মতো প্রতিপক্ষ। আর দ্বিতীয় ম্যাচে হারার পর সেই সিশেলসই এখন কাবরেরা ও তার শিষ্যদের কাছে বড্ড কঠিন প্রতিপক্ষ।
বাস্তব সত্য হলো, এখন আর বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে চায় না নেপাল, ভুটানের মতো প্রতিবেশীরাও। উন্নতির লক্ষ্যে তারা খেলে র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকাদের সঙ্গে। এই ফিফা উইন্ডোতেই সাফের বাকি দলগুলো যখন নিজেদের ঝালিয়ে নিতে বেছে নিয়েছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, বাংলাদেশ তখন সাফের প্রস্তুতি নিয়েছে অ্যামেচার সিশেলসের বিপক্ষে খেলে এবং তাতেও হার।
