ডাকাত ধরা নিয়ে বিব্রত পুলিশ

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৩, ০২:২৩ এএম

২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর ভোরে দুবাই প্রবাসী রোমান মিয়া ও তার ফুফাতো ভাই মনির হোসেন যাচ্ছিলেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তাদের বহনককারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি কাওলা ফুটওভার ব্রিজের সামনে এলে পেছন দিক থেকে একটি মাইক্রোবাস এসে গতিরোধ করে। পুলিশ পরিচয় দিয়ে রোমানকে তারা মাইক্রোবাসে তুলে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বেধড়ক মারধর করে। পরে তার কাছ থেকে লুটে নেয় ৫ হাজার ডলার, ২ হাজার দিরহামসহ ৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। পাশাপাশি আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকাও নেওয়া হয়। রামপুরা রোডে যাওয়ার পর তাকে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় রোমান বাদী হয়ে মামলা করেন বিমানবন্দর থানায়। তবে মামলায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকার বিষয়টি গোপন রাখা হয়। কারণ টাকাটি ছিল হুন্ডির।

জানা গেছে, মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। মামলাটির তদারকির দায়িত্ব পান অতিরিক্ত উপ-কমিশনার কায়সার রিজভী কুরাইশী। তদন্ত দলে ছিলেন পরিদর্শক জাহিদুল ইসলামসহ ৫ কর্মকর্তা। তদন্তে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক উপপরিদর্শকের নাম উঠে এলে চমকে যান তদন্তকারী কর্মকর্তারা। জানানো হয় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ডিএমপি কমিশনারকে।

তাদের নির্দেশে সিআইডির ওই কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয় পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় অভিযুক্ত এসআই আকসাদুজ্জামানসহ ৬ জনকে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন আসামিরা। সিআইডি থেকে চাকরিচ্যুত হন আকসাদ।

সম্প্রতি আকসাদ জামিনে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন দপ্তরে ডিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। গঠন করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি। কিছুদিন আগে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিবির কর্মকর্তারা আকসাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এতে অনেকটা বিব্রত হন ডিবির কর্মকর্তারা। তারা ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে পুনরায় তদন্ত চেয়েছেন। এই নিয়ে কমিশনার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। পুনরায় তদন্ত চাচ্ছে পুলিশ।

এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশের দাবি ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। ঘটনাটি আবারও তদন্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রকাশ হওয়ার পর ডিএমপির কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি একপেশে বলে জানিয়েছেন। আমি যতটুকু জানি, কিছুদিনের মধ্যে আবারও তদন্ত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকাতি মামলার আসামি ধরতে গিয়ে আমরা অনেকটা বিব্রত। আসামিরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। অথচ তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে অন্য তথ্য।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সিআইডির সাবেক এসআইকে তুলে নিয়ে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে ডিবি। কিন্তু ঘটনার পর দেখা গেছে, বাদী ভুলে ৪ কোটি টাকার জায়গায় ৪ লাখ টাকার মামলা করেন। আসামিরা গ্রেপ্তার হলে আকসাদের কাছ থেকেই দুই দফায় উদ্ধার করা হয় ৩ কোটি টাকা। এবং ওই টাকা পরে বাদী স্ট্যাম্পে সই করে ডিবির কাছ থেকে নিয়ে যান। তার সব ধরনের অডিও ভিডিও বক্তব্য ও স্ট্যাম্পের কপিও আছে আমাদের কাছে।’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিবির বিরুদ্ধে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে সেই বিষয়ে ওয়াকিবহাল আছি। দেখি কী করা যায়।’

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কে এম হাফিজ আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আকসাদ পেশাদার ডাকাত, এতে কোনো ভুল নেই। দুই আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং প্রযুক্তিগত তদন্তে আকসাদের বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এবং লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধার করে বাদীকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু টাকা ফেরতের পদ্ধতিগত কিছুটা ভুল ছিল। বাদী ভুলে ৪ লাখ টাকার মামলা করলেও পরে দেখা যায় টাকার পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি। এরমধ্যে বাদীকে উদ্ধার হওয়া ৩ কোটি টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যার প্রমাণ ডিবির কাছে রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আগেও ডিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। সেটি তদন্ত করে শুধুমাত্র টাকা ফেরতের পদ্ধতিগত ভুল ছাড়া ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকা-ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে আকসাদ জামিনে বের হয়ে নানা ধরনের অপতৎপরতা চালাচ্ছে। একইসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনটাও আমরা খতিয়ে দেখছি।’   

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আকসাদ ছাড়াও এই চক্রে রয়েছে আরও বেশ কয়েকজন সদস্য। যাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই দেশের কোনো না কোনো থানায় রয়েছে ছিনতাই, ডাকাতিসহ একাধিক মামলা। চক্রের এক সদস্য রংপুরের মাহিগঞ্জের আব্দুল হাকিম মিয়ার ছেলে মোশারফ হোসেন। তার নামে ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা (নম্বর-১৬) হয়। এই মামলায় আর এক আসামি চক্রের অপর সদস্য মাদারীপুরের শিবচরের হানিফ মোল্লার ছেলে মো. সেলিম মোল্লা। তার নামে মাদারীপুরের শিবচর থানায় আরও দুইটি মামলা রয়েছে। মামলা দুইটি দায়ের হয় ২০১০ সালের ৪ মার্চ। চক্রের আরেক সদস্য শিবচরের খালেক মোড়লের ছেলে মো. রিপন মোড়ল। তার নামেও বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা রয়েছে। এছাড়াও তিনি যাবজ্জীবন সাজাভোগ করা আসামি। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার আব্দুল গণি তালুকদারের ছেলে মো. আমির হোসেন তালুকদার চক্রের আরেক সদস্য। তার নামেও বিমানবন্দর ও মতিঝিল থানায় মামলা রয়েছে। এই চক্রের অন্যরা হলো মাদারীপুরের শিবচরের সুলতান সিকদারের ছেলে মো. রুজু মিয়া সিকদার ও চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার রবিউল ইসলামের ছেলে মো. হাসান রাজা। যাদের প্রত্যেকের নামেই বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি অডিও, একাধিক ভিডিও স্টেটমেন্ট, ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ডাকাতির সময়ের সিডিআর তথ্য পাওয়া গেছে।

ফেঁসে যাচ্ছেন ডিবি কর্মকর্তা : তদন্ত শেষে এডিসি ডিবি কায়সার রিজভী কুরায়েশী আকসাদসহ ৭ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর কয়েকমাস জেল খেটে বের হয়ে সেই আকসাদই অভিযোগ করেছেন, ডিবি পুলিশ তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ বাবদ ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আদায় করেছে।

আকসাদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি অন্য একটি মামলায় সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। ওই সময় সিআইডি আকসাদের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেয়। এর ভিত্তিতে তিনি চাকরিচ্যুত হন। ওই অবস্থায় আকসাদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন।

ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ডাকাতি হয়েছে ৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ডিবি আকসাদের কাছ থেকে প্রথম দফায় উদ্ধার করেছে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আর দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার করে ১৪ লাখ টাকা। কিন্তু আকসাদ অভিযোগ করেছেন, তার কাছ থেকে ডিবি মুক্তিপণ নিয়েছে ওই টাকাগুলো। টাকার অঙ্কেরও হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেছি আমরা।’ তিনি বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, রোমান এবং তার ফুফাতো ভাই যে টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন সেগুলো হুন্ডির টাকা। যে কারণে এতগুলো টাকার কথা তারা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেননি। যদিও ডিবি অফিস থেকে বুঝে নেওয়া জিম্মানামায় রোমান লিখেছেন, এজাহারে উল্লেখ ছাড়া বাকি টাকা তার ফুফাতো ভাই মো. মনির হোসেনের। তিনি ভুলে ওই টাকার কথা উল্লেখ করেননি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত