ধূম্রজাল সৃষ্টি করতে সরকার এসব করছে

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৩, ০২:০৭ এএম

ব্যালট পেপারে নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়েছে, সেটা বড় কোনো ইস্যু নয় বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, ধূম্রজাল সৃষ্টি করতে সরকার এসব করছে। নির্বাচনের সময় কোন সরকার ক্ষমতায় থাকবে সেটাই মূল বিষয়। কারণ ২০১৪ ও ’১৮ সালে দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যালটে হয়েছে। যার একটি হয়েছে একতরফা ও দ্বিতীয়টি হয়েছে রাতের আঁধারে। তাই সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে। গতকাল সোমবার বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেছেন। ১০ দফা দাবি আদায়ে বিএনপিসহ বর্তমান সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যে আন্দোলন করছে, তাতে অনড় থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা।

বিএনপি ইভিএম বা ব্যালট নিয়ে আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। গতকাল রাজধানীর লেডিস ক্লাবে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সদস্যদের সম্মানে বিএনপি আয়োজিত ইফতারে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে (ব্যালটে নির্বাচন) আমাদের একটুও আগ্রহ নেই। কারণ আমরা পরিষ্কার করে বলেছি, জাতির মূল সংকট হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি। নির্বাচনকালে কোন ধরনের সরকার থাকবে সেটাই হচ্ছে প্রধান সংকট। এ কারণেই আমাদের গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে, স্বাধীনতার মূল যে চেতনা ছিল, সেই চেতনা থেকে দেশ বহু দূরে সরে এসেছে।’

বিএনপির এই ইফতারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন দলটির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একমত হয়ে যে কথাগুলো বলছি তা হচ্ছে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করে না তাদের অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ বিলুপ্ত করতে হবে, একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে, সেই ইসির অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম। যুদ্ধের যে চেতনা আশা-আকাক্সক্ষা ছিল সব আজকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছি অতীতে যেমন শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এখন আবারও জনগণের সব অধিকারকে কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার হীন চক্রান্ত করছে।’

ব্যালটে ভোটগ্রহণের বিষয়ে ইসির গতকালের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজপথে জনগণের আন্দোলনে নতিস্বীকার করে সরকার এবং ইসি ৩০০ আসনে ইভিএমে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি শুধু ছোট্ট একটি পাওনা। এভাবে সরকার একের পর এক দাবি মেনে নেবে। কারণ আমাদের এক নম্বর দাবি সরকারের পদত্যাগ। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজন করাসহ আরও ১০ দফা। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৪ ও ’১৮ সালের দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যালটে হয়েছে। প্রথমটি করেছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং দ্বিতীয়টি করেছে রাতের আঁধারে। তখনো কিন্তু ব্যালটে নির্বাচন করেছিল ইসি। তাই ৩০০ আসনে ব্যালটে নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত ইসি নিয়েছে তাতে বিএনপির কিছু যায় আসে না। আমাদের প্রধান দাবি সরকারের পদত্যাগ। কারণ সরকার ক্ষমতায় থাকলে ইসি স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করতে পারবে না।’

ইসির সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চোখ আগামী সংসদ নির্বাচনের দিকে। আগামী সংসদ নির্বাচন তারা অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায়। কারণ বিগত নির্বাচনগুলো অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এ অবস্থায় চাপে পড়ে সরকার বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনতে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। এ ধরনের নানা ফন্দি-ফিকির সরকার করতে থাকবে। তবে সরকার পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন থামবে না। আমরা ঘরে ফিরে যাব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সরকার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য। কিন্তু বিএনপি তখন সে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। কারণ শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান থাকলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ইসি স্বাধীনভাবে নির্বাচন করতে পারবে না উল্লেখ করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচন করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। তাদের সঙ্গে থাকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এরপর জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) মাঠপর্যায়ে চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এসব ডিসিকে আবার নিয়ন্ত্রণ করা হয় প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার সচিবালয় থেকে। আর সচিবালয় নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। তৃণমূল প্রশাসন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের বাসা থেকেই বের হতে দেন না। বিগত নির্বাচনে বিএনপির অর্ধশতাধিক প্রার্থী তাদের বাসা থেকে বের হতে পারেননি।’

গত বছর ১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার গোলাপবাগে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১০ দফা ঘোষণা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দাবি হলো বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ কারাবন্দি সব রাজনৈতিক নেতার মুক্তি; গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত