প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল বিশ্বব্যাংক ও এডিবি

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৩, ১১:৫৪ পিএম

চলতি অর্থচবছরের বাজেটে সরকারের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। সরবরাহ সংকট ও পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে পুরো বিশ্বই কঠিন সময় পার করছে। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্বল্প ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য।

এমন বাস্তবতায় উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগে যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, তা থেকে সরে এসেছে। আগের চেয়ে প্রবৃদ্ধি কমিয়ে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি তাদের নতুন পূর্বাভাসে বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হতে পারে যথাক্রমে ৫ দশমিক ২ ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এডিবি বলছে, মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হবে।

গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঢাকা অফিসে আয়োজিত দুটি পৃথক  সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো। এডিবির তথ্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সন চ্যাং হং। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যাডিমন গিনটিংও উপস্থিত ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। অন্যদিকে ‘স্ট্রং স্ট্রাকচারাল রিফরমস ক্যান হেল্প বাংলাদেশ সাসটেইন গ্রোথ’ বা শক্তিশালী কাঠামোগত সংস্কার বাংলাদেশকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে এমন শিরোনামের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক তাদের পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি কমালেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য তা বাড়িয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ ঝুঁকি এখনো আছে উল্লেখ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটি বলছে, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো খুব বেশি তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। দেশের ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের উন্নয়নবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমে এলে মধ্য মেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে। সংস্থাটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উচ্চ দ্রব্যমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২০ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৩০ কোটি ডলার; অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রার মজুদে চাপ বাড়ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস প্রতিবেদনেও বিশ্বব্যাংক একই পূর্বাভাস দিয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। একই বছরের জুনে পূর্বাভাস দিয়েছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশের; অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটি জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতে নানা ধরনের কড়াকড়ি ও আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার চলতি অর্থবছরে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে। সেই সঙ্গে বৈশি^ক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা তো আছেই। ডলারের একাধিক বিনিময় হারের কারণে ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ বাড়ছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। তাদের ভাষ্য, এতে রপ্তানি নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং প্রবাসী আয় কমছে। বাজারভিত্তিক একক বিনিময় হার নির্ধারণ করা হলে বহির্বাণিজ্যে ভারসাম্য আসবে বলে মত দিয়েছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের প্রধান আবদুল্লায়ে সেক বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশি^ক অনিশ্চয়তা বিশে^র বিভিন্ন দেশে প্রভাব ফেলেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ক্রমবর্ধমান সুদহার ও গতি হারানো বৈশি^ক প্রবৃদ্ধির আঁচ বাংলাদেশের গায়েও লাগবে। আব্দুল্লায়ে সেক আরও বলেন, সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা বা ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়াসে বিশ্বব্যাংক পাশে থাকবে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, কাঠামোগত সংস্কার, যেমন বাণিজ্য সংস্কার ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে। প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তা সহায়ক।

এদিকে গতকাল এডিবির প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০২৩’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বৈশি^ক সংকটেও বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিন্তু আশাব্যঞ্জক। কেননা রপ্তানি গ্রোথ দিন দিন কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটও প্রভাব ফেলেছে। প্রবৃদ্ধির হার ধীরগতির অন্যতম কারণ ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ। ফলে বৈশি্বক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ গত বছর ছিল মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ, সেখান থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশি^ক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও।

সংস্থাটি বলছে, স্থানীয় ভোগ-চাহিদা হ্রাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশি^ক অর্থনীতির ধীর গতিতে পণ্য রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমবে।

এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যাডিমন গিনটিং বলেন, ‘সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈশি^ক প্রতিকূলতার প্রভাবেও তুলনামূলকভাবে ভালো করছে। পাশাপাশি সব খাতেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, যা এই কঠিন সময়েও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। এই সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহকে শক্তিশালী করা, আর্থিক খাতকে গভীর করা এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ানো জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের জলবায়ু এজেন্ডার সঙ্গে সংগতি রেখে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় নবায়নযোগ্য শক্তি সরবরাহের দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। এ জন্য একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

এডিবির প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ কম হবে। কারণ জ্বালানি ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে নানা কারণে উৎপাদন খরচও বেশি। রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি, কঠোর ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং পাবলিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিও ধীর হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত