যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন বিতর্কিত মন্তব্য, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে সর্বদা আলোচনায় থাকতেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গায় উসকানি এবং বিলাসবহুল বাড়ি থেকে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি উদ্ধারে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ছিল। ট্রাম্পকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল রিপাবলিকান শিবিরে, তার উগ্র সমর্থকরাও ঝিমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু কেবল একটি মামলা আবারও আলোচনায় নিয়ে এলো ট্রাম্পকে, সেই সঙ্গে ভাটা পড়া জনপ্রিয়তায় ফিরে এলো জোয়ার। এসবই ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাড়তি মনোযোগ এনে দিল। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্পই হলেন প্রথম কোনো সাবেক প্রেসিডেন্ট, যাকে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু এত বড় ঘটনাও টলাতে পারেনি ট্রাম্পকে। পর্নো তারকার মুখ বন্ধে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ দিয়েছেন এ অভিযোগে অভিযুক্ত ও গ্রেপ্তার ট্রাম্প এখনো মচকাননি। যার প্রমাণ পাওয়া গেল আদালতে হাজিরা দিয়ে ফিরে আসা ট্রাম্পের উত্তেজিত ভাষণে। তার বিরুদ্ধে এরকম আইনি পদক্ষেপকে সামনের নির্বাচনের জন্য পুঁজি হিসেবে দাঁড় করাতে তৎপর যুক্তরাষ্ট্রের এ সাবেক প্রেসিডেন্ট। আদালত থেকে ফেরা ট্রাম্পের বক্তৃতামঞ্চেই দেখা গেছে নির্বাচনী প্রচারণার আমেজ, যেখানে তার পেছনে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পতাকা এবং বক্তার সামনে বড় করে লেখা ‘ট্রাম্প’, এর ঠিক নিচেই লেখা আছে তার নির্বাচনী স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন।’
অন্যদিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন মামলায় ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য’ দেখছেন অনেকে, এমন কি রিপাবলিকান পার্টির ট্রাম্প বিরোধীরাও। ট্রাম্পের পক্ষে এখন অনেকটাই একাট্টা রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে উগ্র ট্রাম্প সমর্থকরাও আবার নেমে আসছেন রাস্তায়। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রইলেন ট্রাম্প। ৭৬ বছর বয়সী ট্রাম্পকে এখন একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা এবং মামলা সামলাতে হবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, সামনের বছর জানুয়ারি মাস নাগাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, সামনের বছর যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য লড়বেন ট্রাম্প, তখন তাকে আবার আদালতেও হাজিরা দিতে হবে।
তার বিরুদ্ধে ৩৪টি অপরাধমূলক অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনের সময় ক্ষতি হতে পারে, এমন তথ্য লুকাতে তিনি নকল কাগজপত্র তৈরি করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে এক পর্নো তারকার মুখ বন্ধ করার জন্য তাকে অর্থ ঘুষ দিয়েছিলেন। ওই তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলস জানিয়েছিলেন ট্রাম্পের সঙ্গে তার যৌন সম্পর্ক ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত মঙ্গলবার আদালত থেকে ফ্লোরিডায় ফিরে যাওয়ার পর নিজের মার-এ লাগোর বাড়িতে ফিরে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, এসব মামলার মানে হচ্ছে পুরো জাতিকে অপমান করা। দুবছর পর হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী এ রাজনীতিক বলেন, তার নির্বাচনী প্রচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ডেমোক্র্যাটরা যে ষড়যন্ত্র করেছে, তার শিকার তিনি।
এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে , এ মামলায় কার্যত বেড়েছে ট্রাম্পের নির্বাচনী গুরুত্ব। অনেকের মতে, গোটা ইস্যুই পরিণত হয়েছে তার নির্বাচনী প্রচারণায়। বিভিন্ন জনমত জরিপে, দলীয় মনোনয়নের দৌড়েও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে এই টাইকুন। গত সপ্তাহে ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করার পর থেকে তার নির্বাচনী তহবিলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে (তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮০ লাখ ডলারের বেশি), তা গর্বের সঙ্গে জানিয়েছে ট্রাম্প শিবির। প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী অন্যদের সঙ্গে তার ব্যবধান যে আরও বেড়েছে, জনমত জরিপকে উদ্ধৃত করে তাও বলছে তারা। মামলার প্রয়োজনে অভিযুক্তদের মুখমণ্ডলের ছবি লাগে, যা মাগশট হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ট্রাম্পের মতো সুপরিচিত একজন, যিনি একসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তার মাগশট তোলার প্রয়োজন হবে কি না তা স্পষ্ট নয়। অবশ্য ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউজে তার এক সময়ের মুখপাত্র হোগান গিডলি রসিকতা করে বলেছেন, ‘(মাগশট তুললে) সেটি হবে সর্বকালের সবচেয়ে পুরুষোচিত সুদর্শন ছবি।’ ট্রাম্প শিবির যে এমন উদ্ধত সাহসী আচরণ করবে, তা অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এই মামলার কারণে রিপাবলিকান দলের ভেতরেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা যেভাবে তার পক্ষে আসতে বাধ্য হয়েছেন সে দিকটি বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। এদের মধ্যে অন্যতম উতাহর সিনেটর মিট রমনি। ট্রাম্পের বিরোধীতায় বরাবরই সরব থাকলেও এবার তিনি বলেছেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে এসব অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। কৌসুলিরা রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘অপরাধী’ তকমা দেওয়ার বাজে নজির তৈরি করছেন। এ প্রবণতা বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের ভরসা নষ্ট করছে।’ তার আগে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস বলেন, ‘রাজনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে আইনি ব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার আইনের শাসনের পুরোপুরি বিপরীত।’
ট্রাম্পের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও বলেছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমেরিকান বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে বিশ্বকে একটি ‘ভয়ানক বার্তা’ দিয়েছে। ডিস্যান্টিস আর পেন্স সেটাই বলছেন, যেটা তাদের সমর্থকরা শুনতে চান।
বিবিসির এক প্রতিবেদক বলেছেন, জর্জিয়া থেকে উইসকনসিন জুড়ে তিনি অনেক নিরপেক্ষ বা সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছেন; যারা তাকে বলেছে, ট্রাম্প যখন দায়িত্বে ছিলেন সে সময় তার নীতিকে তারা পছন্দ করলেও তাকে ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা আর নাটকীয়তা চলছে, সেটি নিয়ে তারা এখন বিরক্ত। মামলাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে এসে ট্রাম্প সেইসব ভোটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে জিততে যাদের ভোট তার খুবই দরকার। তবে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকরা এমনটা মানছেন না।
যেমন ট্রাম্প-ভক্ত জন ম্যাকগুইগান। গত সোমবার ট্রাম্প টাওয়ারের বাইরে সাবেক প্রেসিডেন্টের পক্ষে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানো এই সমর্থকের মতে, আদালতের এই বিচার ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে ভালোই সাহায্য করবে। তিনি বলেন, ‘যারা ইতিমধ্যে ধরেই নিয়েছেন ট্রাম্প হলেন শয়তানের প্রতিমূর্তি, বিচারে ফলাফল যাইহোক, তারা এতে প্রভাবিত হবেন না; যেমনটা হবেন না ট্রাম্পের গোঁড়া সমর্থকরাও। তবে এই দুইয়ের মাঝামাঝি যেসব ভোটাররা রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই মামলা ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের ক্ষতির কারণ না হয়ে সম্পদের চেয়েও বেশি কিছু হতে পারে।’ ট্রাম্পের গ্রেপ্তার, বাড়ি ফিরে নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার বিবিসির উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি অ্যান্থনি জার্চার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে ট্রাম্পের আইনি-রাজনৈতিক লড়াইয়ের কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। তার লেখায় বলা হয়েছে, ট্রাম্প এই মামলার যৌক্তিকতা ও বিচারক হুয়ান মার্চেনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশৃঙ্খল পরিবেশ যেন সৃষ্টি না হয় এ যুক্তিতে বিচারক ট্রাম্পের বিচার প্রক্রিয়া গণমাধ্যমে সম্প্রচার নিষেধ করেছেন। কিন্তু বিবিসির প্রতিবেদক বলছেন, মঙ্গলবার আদালত ভবনের বাইরে ট্রাম্পের সমর্থক ও বিরোধীরা যে উত্তপ্ত বাক্যবাণ একে অন্যের বিরুদ্ধে নিক্ষেপ করেছেন তাতে গোটা পরিস্থিতি সার্কাসে পরিণত হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই সার্কাস আরও বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি।
