ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এক শহরে বিক্ষোভ চলার সময় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হন এলাহে তাভোকোলিয়ান নামের এক তরুণী। ডান চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন, ব্যথায় কাতরাচ্ছেন এমন ভিডিও তখন সাড়া ফেলেছিল বিশ্বজুড়ে। ওই ঘটনায় পিএইচডি ডিগ্রির শিক্ষার্থী এলাহে তাভোকোলিয়ান তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তার তিন মাস পর এলাহে তাভোকোলিয়ান ইনস্টাগ্রামে তার জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়ের একটি ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, তোমরা আমার চোখের দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলে। কিন্তু আমার হৃৎপিণ্ড এখনো সচল রয়েছে। আমাকে দৃষ্টিহীন করার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। কিন্তু এই ঘটনা বহু লোকের চোখ খুলে দিয়েছে। আমার হৃদয়ের গভীরে থাকা আলো আর আগামীতে সুদিনের আশা আমার মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু তোমাদের হৃদয় এবং তোমাদের সেনাপতির হৃদয় দিন দিন অন্ধকারে ডুবে যাবে। তিনি লেখেন, কিছুদিনের মধ্যে আমি পাব একটি কাচের চোখ, আর তোমরা পাবে পদক।
বিবিসি বলছে, গত সেপ্টেম্বরে সঠিকভাবে মাথার স্কার্ফ না পরার অভিযোগে ইরানের নীতি পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। সেসময় এলাহের মতো বহু বিক্ষোভকারীর মুখ লক্ষ্য করে ছররা বন্দুক থেকে গুলি চালানো হয়। দৃষ্টি হারান অসংখ্য বিক্ষোভকারী। এলাহের মতো তারাও এখনো সরব অনলাইনে। তারাও নিজেদের চোখ হারানোর ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন। তারাও বলছেন, চোখের আলো কেড়ে নিলেও মনের আলোয় তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ থাকবেন। চালিয়ে যাবেন প্রতিবাদ।
এলাহে সম্প্রতি তার খুলিতে ঢুকে থাকা একটি বুলেট অপসারণের জন্য ইতালিতে গেছেন। সেখানে তার একটি বড় অপারেশন হয়েছে। হাসপাতালের বিছানা থেকে তিনি নিজের একটি ভিডিও পোস্ট করে বলেছেন, এই ঘটনা বর্ণনা করার জন্যই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। অপারেশনের পর তিনি বিবিসি ফার্সিকে বলেছেন, তিনি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে বুলেটটি দেখানোর পরিকল্পনা করছেন।
বিবিসির ভাষ্য, পুলিশের গুলিতে যেসব তরুণ-তরুণী অন্ধ হয়ে গেছেন তারা বলছেন, বেছে বেছে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। যাদের মুখে গুলি লেগেছে আইনের ছাত্র গজল রঞ্জকেশ তাদের একজন। নভেম্বরে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসে তার গুলি লাগে। এই ঘটনা সবাইকে জানানোর জন্য ২১ বছর বয়সী গজলই প্রথম সোশ্যাল মিডিয়ায় তার আঘাতের বিষয়ে প্রকাশ্যে ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। হাসপাতালের বিছানা থেকে তিনি যে ভিডিওটি শেয়ার করেছেন তাতে দেখা যাচ্ছে তার ডান চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। কিন্তু তিনি তখনো আঙুল দিয়ে বিজয়-সূচক ভি চিহ্ন দেখাচ্ছেন। এই ভিডিওটি ভাইরাল হয়, দেশ-বিদেশে ইরানিরা দেখতে পান যে কীভাবে তরুণদের বন্দুকের নিশানা করা হচ্ছে। গজলের এই পোস্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক অনন্য ঘটনা।
একইভাবে আঘাত পেয়েছেন যেসব নারী-পুরুষ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ঘটনা শুধু তাদের জীবনেই ঘটেনি। ট্রমায় সাহায্য পাওয়ার জন্য তারা অনলাইনে একই ধরনের কিছু মানুষকে খুঁজে পান।
ইনস্টাগ্রামে ফার্সি ভাষায় গজল যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে লেখা হয়েছে : চোখের পলক ফেলার শব্দ যেকোনো চিৎকারের চেয়েও বেশি উচ্চকিত। সম্প্রতি তিনি নিজের কিছু নতুন ছবি পোস্ট করেছেন। বিবিসি বলছে, ভালোভাবে লক্ষ্য না করলে ছবিগুলো দেখে মনে হবে এগুলো ফ্যাশন ফটোগ্রাফি। তিনি লিখেছেন, এখনো অসহ্য ব্যথা রয়েছে, কিন্তু এতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। আমার জীবন চলতে থাকবে কারণ আমার কাহিনি এখনো শেষ হয়নি। আমাদের বিজয় এখনো আসেনি ঠিকই, তবে প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে।
ইরানজুড়ে এভাবে মোট কতজন মানুষ আহত হয়েছেন তার সঠিক হিসাব কেউ জানে না। হাসপাতাল থেকেই গ্রেপ্তার হতে পারেন এই ভয়ে অনেক বিক্ষোভকারী চিকিৎসা সেবা নিতেও ভয় পেয়েছিলেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা হিসাব করে বের করেছে, একই রকম আহত অন্তত ৫০০ জন গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে তেহরানের তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
তেহরানের এক স্ট্রিট পারফরমার মোহাম্মদ ফারজি সেপ্টেম্বরে গুলিবিদ্ধ হন। বার্ডশট বা ছররা গুলি তার চোখে ঢুকে যায়। তিনি লিখেছেন, এ নিয়ে আমার কোনো অনুতাপ নেই। আমি গর্বিত যে মানুষের মুক্তির জন্য আমি আমার চোখটা উৎসর্গ করতে পেরেছি।
কিন্তু ইরানের দাঙ্গা পুলিশের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান কারামি সম্প্রতি ইরানি গণমাধ্যমে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, তার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ প্রতিবাদকারীদের মুখে গুলি চালানোর অভিযোগগুলো এলো ‘অপপ্রচার।’
