বাংলাদেশের আইরিশ শিক্ষা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৩৪ এএম

মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেও যারা ছিল ইনিংস হারের শঙ্কায়, বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনের শেষে সেই আয়ারল্যান্ডই দেখছে জয়ের স্বপ্ন। সারা দিন ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৮৬ রান তুলে ১৩১ রানে এগিয়ে গেছে তারা। হাতে থাকা ২ উইকেট নিয়ে তাদের আরও ত্রিশ-চল্লিশ রান যোগ করার স্বপ্ন। অন্যদিকে দ্বিতীয় দিনের শেষে আয়ারল্যান্ডের ৪ উইকেট মাত্র ২৭ রানেই তুলে নেওয়ার পর এখন হার বাঁচানোর লড়াই বাংলাদেশের।

বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড সিরিজের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান মধুমতি ব্যাংকের প্রধান কাল এসেছিলেন মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। উপস্থিত ছিলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানও। দ্বিতীয় দিন শেষে আইরিশদের স্কোরকার্ডের যা অবস্থা দেখেছিলেন, তাতে তৃতীয় দিন খেলা শেষ হয়ে যাবে-  ধরে নিয়েছিলেন অনেকের মতো তারা। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করেই আইরিশরা কাল সারা দিন ব্যাট করেছে। ৯০ ওভারে যোগ করল ২৫৭ রান। গড়ে ওভারপ্রতি পৌনে তিন করে রান তুলে আইরিশরা দেখিয়ে দিয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটটা কীভাবে খেলতে হয়। দায়িত্বশীল ব্যাটিং কীভাবে করতে হয় সেটাই দেখিয়েছেন হ্যারি টেক্টর, লোরকান টাকার, অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইনরা। মাত্র চতুর্থ টেস্ট খেলতে নামা একটি দল, যারা প্রায় চার বছর পর টেস্ট খেলছে এবং যে দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটে কোনো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতাই নেই সেরকম একটি দলই গোটা দিন খাটিয়ে মারল ২৩ বছর ধরে টেস্ট খেলা দলকে।

ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ইংল্যান্ড টেস্ট দলের কোচ হওয়ার পর লাল বলের ক্রিকেটেও তারা আমদানি করেছে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির আগ্রাসন। ম্যাককালামের ডাকনাম ‘বাজ’ থেকে অনেকেই এই প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন ‘বাজবল’। বাংলাদেশও যেন ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় দিনে সেই ‘বাজবল’ই অনুকরণ করতে গিয়েছিল। সাকিব আল হাসান বোর্ড প্রেসিডেন্টকে বলেন তিনি দ্রুততম শতরান করতে চান! লিটন দাসও ব্যাট করেছেন ওয়ানডে মেজাজে। ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্স এমন ব্যাটিংয়ে খুশিই হয়েছিলেন। প্রতি ওভারে ৪.৫৮ করে ৮০ ওভারে ৩৬৯ রান করা বাংলাদেশকে এখন দ্বিতীয় ইনিংসে দুইশোর কাছাকাছি রান তাড়া করতে হতে পারে, যেটা টেস্ট ম্যাচে চতুর্থ ইনিংসে সহজ নয়।

যতই আগ্রাসী ক্রিকেটের তত্ত্ব আমদানি করা হোক না কেন, টেস্ট ক্রিকেটের চিরায়ত এবং ধ্রুপদী সৌন্দর্য যে সময়ের সমান্তরালে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই আর ধৈর্যের পরীক্ষায়, সেটাই কাল একবার দেখিয়েছেন আইরিশ ব্যাটসম্যানরা। শুরুতে হ্যারি টেক্টর আর পিটার মুর সেই পরীক্ষা নিচ্ছিলেন বোলারদের, মুর ৭৮ বলে ১৬ রান করে আউট হওয়ার পর  মনে হলো এই বুঝি প্রতিরোধের দেয়াল ভাঙল। কিন্তু মুরের বিদায়ে উইকেটে আসা লোরকান টাকার শুধু প্রতিরোধের দেয়াল হয়েই দাঁড়াননি, পালটা আক্রমণও করেছেন। লাঞ্চ থেকে চা বিরতি পর্যন্ত দ্বিতীয় সেশনে আয়ারল্যান্ড বাংলাদেশকে চমকে দিয়ে তুলে নেয় ১০৬ রান।

আশ্চর্যজনক ভাবে কাল বোলিং করতে অনেকটাই অনীহা ছিল সাকিবের। প্রথম ইনিংসেও সাকিব হাত ঘুরিয়েছেন ৩ ওভার মাত্র, দ্বিতীয় ইনিংসে নতুন বল হাতে আক্রমণে এসে জোড়া শিকার করলেও কাল

তৃতীয় দিনে সাকিব বল করেছেন মাত্র ৬ ওভার। যেখানে আরেক বামহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম করেছেন ৩৮ ওভার, নিয়েছেন ৪ উইকেট। দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ডকে সাকিবের বোলিংয়ে না আসা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর ছিল, ‘এই প্রশ্নটা আপনাদের সাকিবের কাছেই রাখা উচিত। আমার কোনো ধারণা নেই।’ সাকিবকে বল হাতে বেশি ব্যস্ত হতে না দেখে অবাক হয়েছেন শতরান করা টাকারও, ‘ আগের দিন সে দারুণ বোলিং করেছে। আমি এটা বলব না যে তাকে বোলিংয়ে না দেখে আমি হতাশ, আমি তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলব না।’

আইরিশদের হাতের মুঠোয় পেয়েও নাটাইয়ে ঢিল দিল বাংলাদেশ, অধিনায়ক নিজেই বল করলেন না যখন চেয়ে চেয়ে দেখলেন একের পর এক জুটি গড়ছে প্রতিপক্ষ। তিন পেসার নিয়ে আক্রমণ সাজানোর পর দুটো নতুন বলই উঠল স্পিনারদের হাতে, পেসাররা দিনভর ২৭ ওভার বল করে এনে দিলেন মাত্র ২ উইকেট। আয়ারল্যান্ডের মত নবীন টেস্ট দলের বিপক্ষেও এসব শিশুতোষ ভুল ভোগাল বাংলাদেশকে। সেই সঙ্গে তুলে দিল পুরনো সেই প্রশ্নটাও। দুই দশকের বেশি সময় ধরে টেস্ট খেলার পরও টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা কতটা বুঝল বাংলাদেশ!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত