আমেনা ফার্মেসির বিনিয়োগ ভেলকি

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ০৬:০৮ এএম

হীরা ইয়া ইয়াসমিন রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা। ২০১৫ সালে স্বামীর বন্ধুর মাধ্যমে কথা হয় মুক্তারুল হক নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে, তখন তারা মোহাম্মদপুরে থাকতেন। সে সময় মুক্তারুল তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মা আমেনা ফার্মেসির কথা জানান। এখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে অধিক মুনাফার প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া তার স্বামী ও ছেলেকে এই ফার্মেসিতে চাকরি দেওয়ার কথা জানান। স্বামী-সন্তানের চাকরি ও বিনিয়োগের টাকা থেকে লাভের কথা বিবেচনা করে মুক্তারুলকে ওই বছর চার লাখ টাকা দেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাদের গচ্ছিত টাকা থেকে বিনিয়োগ বাড়িয়ে করেন ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু এই বিনিয়োগ যে ভুল জায়গায় হয়েছে যখন বুঝতে পারেন তারা ততক্ষণে তাদের টাকা নিয়ে দেশ ছেড়ে গেছেন মুক্তারুল।

এভাবে রাজধানীর আদাবরে ফার্মেসি খুলে নীরবে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা করে পালিয়ে যান মুক্তারুল ও তার স্ত্রী রুবিনা আক্তার। তাদের এই বিনিয়োগ ভেলকিতে পড়ে টাকা খুইয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বহু মানুষ।

পুলিশ জানিয়েছে, মুক্তারুলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করেছেন অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী। তাদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার লোক রয়েছে। তবে অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষজন। তাদের অনেকেই পৃথক মামলাও করেছেন। মুক্তারুল দম্পতির বিরুদ্ধে আদাবর থানায় প্রতারণার মামলা ছাড়াও অর্থ পাচার ও চেক ডিজঅনারের মামলা হয়েছে।

এই প্রতারণার ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট বাদী হয়ে অর্থ পাচার আইনে একটি মামলা করেছে। মামলার তদন্ত শেষে সংস্থাটি বলেছে, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে জমি কেনার প্রমাণ মিলেছে।

সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে জানান, মুক্তারুলের ব্যাংক হিসাবসহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এসব তথ্য পর্যালোচনা ও বিস্তারিত তদন্তে ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছেন তারা।

তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় লোকজনের দাবি অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি। মুক্তারুলের কেনা জমির দাম প্রায় ২০ কোটি টাকা হলেও দলিলে কম দেখানো হয়েছে।

ভুক্তভোগী হীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টাকা দেওয়ার পর লিখিত চুক্তিও করেন মুক্তারুল। তার স্বামী-সন্তান আমেনা ফার্মেসিতে চাকরি শুরুর পর কিছুদিন বেতন দিলেও একপর্যায়ে বন্ধ করে দেয়। এরপর মুক্তারুল কালক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন মুক্তারুল অনেক মানুষের টাকা নিয়ে ভারত পালিয়ে গেছেন।

মুক্তারুল ও তার স্ত্রী বিনিয়োগের প্রলোভন দেওয়া ছাড়াও ওষুধ বিক্রির নামে হাতিয়েছেন বহু মানুষের টাকা। এমন একজন ভুক্তভোগী মো. শাহীন কাউসার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ভারতীয় ওষুধ প্রয়োজন ছিল, যা দেশে পাওয়া যেত না। আমেনা ফার্মেসিতে ওইসব ওষুধ কেনার জন্য গেলে তারা আমাকে ভারত থেকে এনে দেওয়ার কথা বলে। এরপর এসব ওষুধের জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো ওষুধ দেয়নি।’

সিআইডি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মুক্তারুল ও রুবিনা দম্পতির বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এলাকায়। প্রায় ১০ বছর আগে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার পর শুরুতে আদাবর এলাকায় সাইকেলে ফেরি করে বিভিন্ন ফার্মাসিতে ওষুধ বিক্রি করতেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ফার্মাসির মালিকদের কাছ থেকে নগদ টাকায় ওষুধ নিয়ে বিক্রি করে অর্ধেক লাভ তাদের দিতেন। এভাবে তারা আদাবর এলাকায় বিশ্বস্ততা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর মুক্তারুল এলাকার লোকজনের সহযোগিতায় প্রায় আট বছর আগে বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটিতে মা-আমেনা ফার্মেসি নাম দিয়ে ওষুধের দোকান খোলেন। পরে স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফার্মেসির জন্য ওষুধ কিনে বিক্রি করে লাভের একটি অংশ দিতেন। এভাবে আদাবর এলাকায় তাদের দোকানটি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। পরে মুক্তারুল পর্যায়ক্রমে শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডে মোল্লা ড্রাগ নামে তার দ্বিতীয় দোকান, একই এলাকার ১২ নম্বর রোডে তৃতীয়, আজিজ মহল্লায় মোহাম্মাদিয়া মেডিসিন নামে চতুর্থ দোকান, শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডে ডক্টরস মেডিসিন নামে পঞ্চম দোকান খোলেন। এ ছাড়া বাবু বাজারের নগর লেন এলাকায় মা আমিনা ফার্মেসি নামের ওষুধের দোকান চালু করেন।

এরপরই মুক্তারুল দম্পতি অন্যান্য এলাকার লোকজনকে লোভনীয় লভ্যাংশ দেওয়ার ফাঁদ পেতে টাকা নিয়েছেন। শুরুতে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীকে লভ্যাংশের টাকা ঠিকভাবেই দিয়েছেন। এরপর ২০১৮ সাল থেকে পাওনাদারদের টাকা দেওয়া মোটামুটিভাবে বন্ধ করে দেন।

মোহাম্মদ হামিমুর রহমান শিকদার (৫১) নামে এক ভুক্তভোগী তার লভ্যাংশের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করলে অন্যরাও বিষয়টি জানতে পারেন। তারাও পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে মুক্তারুল দম্পতি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে যান। প্রায় ৬০ জন পাওনাদারের তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত মুক্তারুল হক (৩৮) এবং তার স্ত্রী রুবিনা আক্তার (৩১) ও তাদের দুই ছেলে ইমরান আহম্মেদ (১৩) ও মো. জাইন আহম্মেদকে (৭) নিয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতে গিয়ে আত্মগোপন করেন। পরে তাদের আত্মীয়স্বজনদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ২০১৯ সালের মার্চে ছেলেদের নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এ সময় তারা রাজধানীর শ্যামপুরের তাদের এক আত্মীয়র বাসায় অবস্থান করেন। বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী মোহাম্মদ হামিমুর রহমান শিকদার বাদী হয়ে আদাবর থানায় একটি মামলা করেন। এরপর আরও অনেকেই মামলা করেন। গ্রেপ্তার করা হয় মুক্তারুল দম্পতিকে। পরে তারা জামিন পান।

হাতিয়ে নেওয়া টাকার গন্তব্য : ভুক্তভোগী হামিমুর রহমান শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ৫৫ লাখসহ ৭৩ লাখ টাকা দিয়েছিলাম মুক্তারুলকে। আমরা শুনেছি তিনি আদাবরে জায়গা কিনেছেন, সেখানেও মালিকের ৩০ লাখ টাকা বাকি রেখে দলিল করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তারুল তো ব্যবসা করতেন, এমন তো হয়নি তার সব টাকা লোকসান হয়েছে। কারণ তার ফার্মেসিতে বিক্রি ভালো ছিল। প্রতিদিন প্রায় এক লাখ টাকার বিক্রি হতো। অনেকেই দাবি করছেন, টাকাগুলো মুক্তারুল ভারতে পাচার করেছেন।’

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকার অধিকাংশই ভোগবিলাসে ব্যয় করেছেন মুক্তারুল দম্পতি। সার্বিক তদন্ত ও প্রতারক দম্পতির জবানবন্দি অনুযায়ী ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা পাঁচ কোটি টাকা গ্রহণ করেছেন। তবে অন্য কোনো সম্পদের প্রমাণ না পাওয়ায় টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত