আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নির্বাচনকালীন সরকারসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। এবার তাদের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে সমমনা কয়েকটি বামদল। এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। জোটের শীর্ষ নেতারা বলছেন, তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। ঈদের পর যুগপৎ আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি আসতে পারে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা জানান, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিসহ সরকারের পদত্যাগের দাবি নিয়ে জোটটি আন্দোলনে রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিকল্প শক্তি হিসেবে রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চাইছেন তারা। একই সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনেও সমমনাদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তারই অংশ হিসেবে ফ্যাসিবাদ বিরোধী বাম মোর্চা, বাংলাদেশ জাসদ ও ঐক্য ন্যাপের সঙ্গেও কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। এসব দল বাম গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আন্দোলন জোরদার করতে ঈদের পর আবারও আলোচনায় বসবেন। সেখান থেকে বড় ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হবে।
জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের আন্দোলনে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমমনা বাম রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্র, যুব, কৃষক, শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলার প্রগতিশীল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যারা দ্বিদলের বাইরে বিকল্প শক্তির সমাবেশ গড়ে তুলতে চান তাদেরকেও আন্দোলনে যুক্ত করা হবে। আন্দোলনের পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে স্থানীয় পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জোটের শীর্ষ নেতারা বলছেন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ টাকার খেলা, পেশিশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, ‘প্রশাসনিক কারসাজিনির্ভর’ বিদ্যমান গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন চলছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। মূলত এর মধ্যে দিয়েই সরকারবিরোধী আন্দোলন গোছানোর কাজ চলছে।
২০১৮ সালে সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে ৮টি দল নিয়ে গঠিত হয় বাম গণতান্ত্রিক জোট। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও জোটবদ্ধ অংশগ্রহণ করে তারা। ২০২২ সালে এসে ভাঙন ধরে জোটে। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হওয়ায় গণসংহতি আন্দোলন এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিকে জোট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
বামজোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদের (বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যুগপৎ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ বিষয়ে কয়েকটি দলের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ জাসদ ও ঐক্য ন্যাপের সঙ্গে দ্রুততম সময়ে আলোচনা করব। যাতে ঈদের পর আন্দোলনে যেতে পারি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে যাচ্ছি না। আমরা আমাদের মতো করে আন্দোলন করব। তারা (বিএনপি) তাদের মতো করে করছে। সামনের পরিস্থিতি বলে দেবে কী হবে না হবে।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘বামজোট দ্বিদলীয় ধারার বাইরে বিকল্প শক্তি গড়ে তুলবে। কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইতিমধ্যে কথা হয়েছে। তার মধ্যে ঐক্য ন্যাপ, বাংলাদেশ জাসদ, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম জোট, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। হয়তো ঈদের পরেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে যুগপৎ ধারার কর্মসূচিতে যাব। আরেকটি হচ্ছে আমাদের বিভিন্ন ছাত্র, যুব, কৃষক, ক্ষেতমজুর বিভিন্ন গণসংগঠনগুলো আছে আমরা তাদের বলেছি, তারা তাদের নিজস্ব দাবিতে আন্দোলন করুক। একই সঙ্গে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করুক। তাদের সঙ্গেও আমরা কীভাবে আন্দোলনের সমন্বয় করতে পারি সেই কাজটি করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করছি, এই সময়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তির সহায়তায় একটি সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। সেই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তারা যে পথ অবলম্বন করছে সেখানে জনগণের স্বার্থ নাই। ওইভাবে সংকট সমাধান করা হলে জনগণের কোনো স্বার্থ রক্ষা হবে না। সুতরাং এই সময় বাম গণতান্ত্রিক জোটকে তার বিকল্প শক্তির সমাবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করা দরকার বলে আমরা মনে করি।’
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘আমাদের আলোচনা এখন ক্রিয়াশীল রয়েছে। আমাদের প্রধান দাবি হচ্ছে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন চাই না। সকলের অংশগ্রহণে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। আমরা মনে করি, এখনো সময় আছে বর্তমান সরকারের। তাদেরই দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচনকালীন একটা গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা বের করা, যাতে সবাই ভোট করতে পারে। না হলে দাবি আদায়ে রাজপথে নামা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার অন্যতম নেতা ও সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘বামজোটের সঙ্গে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের অপসারণ চাই। এটার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যেটা নিয়ে বামজোটের সঙ্গে কোনো দ্বিমত নেই। তবে এ বিষয়ে আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সংকট, আরেকটি হচ্ছে রাজনৈতিক সংকট। এই কয়েকটি বিষয়ে আমাদের আন্দোলন চলমান রাখব। অনেকেই একই বিষয়ে আন্দোলন করছে। তবে তাদের দাবি আদায়ের যে ধরন তাদের সঙ্গে আমাদের সেসব জায়গায় পার্থক্য আছে।’
