ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো এক মানব পাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মাহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে ৩ থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে প্রতারক চক্রের হোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
ডিবি জানিয়েছে, জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণপত্র চাইত ‘কথক একাডেমি’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পর ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে আমেরিকান ভিসার আবেদন করা হতো। যাদের দূতাবাস ভিসা দিত তারা আমেরিকা গিয়ে গা ঢাকা দিত। অবৈধ হয়ে মার্কিন সরকারের কাছে আশ্রয় চাইত। তার আগেই কথক একাডেমি নামের প্রতিষ্ঠানটি ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিত জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সঙ্গে জালিয়াতি করে আসছিল একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র। চক্রটি জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় মানুষকে আমেরিকা পাঠিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে নামসর্বস্ব কথক একাডেমির কোনো রেজিস্ট্রেশনও নেই। প্রতিষ্ঠানটি জাতিসংঘের ইকোনমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিলের স্পেশাল কনসালটেটিভ স্ট্যাটাস দাবি করে। ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এ ধরনের জালিয়াতির বিষয়টি বুঝতে পেরে গত মার্চ মাসে গুলশান থানায় একটি মামলা করে। ওই মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে ৩ থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে আবুল কাশেম শেখ (৫৫), বখতিয়ার হোসেন (৩৫) ও মো. নজরুল ইসলামকে (৪৫) গ্রেপ্তার করে।
ডিবি সূত্র জানিয়েছে, তাদের মধ্যে আবুল কাশেম ভারত থেকে ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশনের ওপরে ডিপ্লোমা করেছেন। আর বখতিয়ার এসএসসি ও নজরুল ইসলাম বিএসএস পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন।
গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া আবুল কাশেমের বাসায় অভিযান চালিয়ে ৩১টি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আবুল কাশেম কথক একাডেমির সিইও পরিচয়ে প্রতারণা ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। তার কথক প্রতিষ্ঠানের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। ২০১২ সাল থেকে ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভিসা পাইয়ে আমেরিকা, জার্মান, জাপান, ইতালি, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রায় ৮০ জনকে পাচার করেছে।
আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে শাহবাগ ও ২০১৩ সালে পল্লবী থানায় মামলা হয়। গুলশান থানার মামলায় গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাসপোর্ট আইনেও তার নামে আরেকটি মামলা হয়েছে। আমেরিকান দূতাবাসের মামলায় একইরকম প্রতারণার দায়ে এর আগে গোলাম কিবরিয়া (৪৩), সাজ্জাদ মো. রিফাত (২৮), শাহনেওয়াজ খান রাফাত (২৫) ও শাহীন আকন (২৭) গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (উত্তর) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগদানের কথা বলে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভুয়া তথ্য দিয়ে ইমেইল পাঠিয়ে আমেরিকান ভিসা সংগ্রহকারীদের বিরুদ্ধে অ্যাম্বাসি কর্র্তৃপক্ষ মার্চ মাসে একটি মামলা করেছিল। ওই মামলায় আগেই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের হোতা কাশেমকে ৩ এবং ৮ এপ্রিল তার সহযোগী বখতিয়ার ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতারকদের এ ধরনের কাজে বহির্বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। এতে করে যারা সঠিকভাবে আমেরিকান ভিসাপ্রাপ্তির আবেদন করেন, তারা নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হন। পাসপোর্টে জাল ভিসা বা সিল ব্যবহার করা দেশের আইনে অপরাধ। তাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করলেই আমেরিকান ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করে না। ভিসা পাওয়ার জন্য সঠিক তথ্য দিতে হবে।’
